← Back to Writing

শেষ গান

Short story

সেন্ট্রাল ফিল্ডের একপাশে বড় করে স্টেজ বানানো হয়েছে । সামনে বড় সামিয়ানা, মোটামুটি অনেক ছাত্র-ছাত্রী বসে আছে । প্রথম বর্ষের যারা তারা সামনের দিকে, তারপর দ্বিতীয় বর্ষ এভাবে । বেশীরভাগই নিজেদের বন্ধু-বান্ধবের গ্রুপ নিয়ে বসেছে । নানা গুজুর গুজুর গল্প হচ্ছে ছোট ছোট গ্রুপে । স্টেজে হালকা ধোঁয়া বের হচ্ছে মেশিন থেকে । লাল-নীল বাতিগুলো আছড়ে পড়ছে নানা ঢেউ তৈরী করে । তৃতীয় বর্ষের ছাত্রদের একটা ব্যান্ড এখন গান করছে । তাদের ক্লাসের ছেলেমেয়েরা খুব উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে । একদম প্রথম সারিতে শিক্ষকরা আছেন, ওনারা সামান্য বিরক্ত , আসলে এ ধরণের ব্যান্ড সঙ্গীত তাদের একটু কম পছন্দ । আজ প্রথম বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠান । এমন না যে এই প্রথমবর্ষের ছেলেমেয়েরা আজই প্রথম ক্লাসে এসেছে । তাদের ক্লাস আসলে শুরু হয়েছে আরও প্রায় বছর খানেক আগে । সামনে তাদের ফাইনাল পরীক্ষা । বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার আর অন্যান্য সময়সূচী অনুযায়ী এখন হচ্ছে তাদের নবীনবরণ । এতে অবশ্য তারা বেশ দুঃখ পেয়েছে তা বলা যাবে না, তারা নানা ইভেন্ট করেছে । কে বলবে এদের সামনে পরীক্ষা? আসলে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে এরকম দিনগুলো ভার্সিটিতে অনেকটা ঈদের দিনের মত আসে । মেয়েরা সবাই নতুন নতুন শাড়ি পরে, অনেকেই হলে বান্ধবী কিংবা সিনিয়র আপুদের কাছ থেকে শাড়ি পরা শিখতে যায় । ভাল শাড়ি পরাতে পারে, কিংবা চুল বেঁধে দিতে পারে এমন আপু বা বান্ধবীরা খুব ব্যস্ত থাকে । সবাইকে সাজিয়ে দিয়ে নিজে তৈরী হতে হবে । ছেলেদের অবশ্য অন্যরকম সমস্যা, বিশেষ করে যারা হলে থাকে । সিঙ্গেল বন্ধু কিংবা রুমমেটদের কাছ থেকে একটা পাঞ্জাবী ধার নেয়া হয়, সকালে উঠে শেভ করা, চুল কাটা নানা ব্যস্ততা । বড় বড় একেকটা গ্রুপ একেকটা ডিপার্টমেন্টের সামনে জড়ো হয়, সবাই মিলে সেই পুরোনো ক্যাম্পাসেই হাঁটাহাঁটি, কিছুক্ষণ পরপর একেকটা ছবি তোলা, ক্যান্টিনের ভীড় ঠেলে দুপুরের খাবার, শেষ বিকেলে বড় গ্রপটা ভেঙ্গে যায়, দু’জন দু’জনে কয়েকদিকে বিছিন্ন হয়ে যায় । কয়েকজন অবশ্য একাই থেকে যায়, তারা হয়তো কোন চায়ের দোকানে আড্ডা জমায় ।

ধোঁয়া বন্ধ হয়ে গেল, ড্রামের শেষ বিটটার পর স্টেজ অন্ধকার হয়ে গেল । একটু বিরতি, নতুন কেউ আসবে স্টেজে । আবার আলো জ্বলতেই দেখা গেল প্রথম বর্ষেরই একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে । তাকে দেখে খানিকটা নার্ভাস মনে হচ্ছে । তার পেছনে সাউন্ডের লোকজন সব গুছিয়ে নিচ্ছে, তারপর তবলায় হালকা টোকা পড়ে । মেয়েটি শুরু করে,

কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া

তোমার চরণে দিব হৃদয় খুলিয়া

কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া

চরণে ধরিয়া তব কহিব প্রকাশি

গোপনে তোমারে, সখা, কত ভালোবাসি

ভেবেছিনু কোথা তুমি স্বর্গের দেবতা

কেমনে তোমারে কব প্রণয়ের কথা……….

এতটুকুর পর পিছনে সুর বাজতে থাকে, পরের লাইনটা হঠাৎ করেই ভুলে যায় মেয়েটি । একটু আগেও নানা গুঞ্জনে মুখর সামিয়ানার নিচে হঠাৎই নেমে আসে পিনপতন নীরবতা, যেন এটা সেন্ট্রাল ফিল্ড না এটা সেন্ট্রাল লাইব্রেরি । অগ্রহায়ণ মাসের সন্ধ্যায় স্টেজে দাঁড়ানো মেয়েটি ঘামতে থাকে । তার গাল বেয়ে নোনতা পানি নামে । এরই মাঝে কোন একদিকে থেকে হঠাৎ ভেসে আসে কিছু ছেলের টিটকারী, হাসাহাসি । সম্ভবত ওদিকে তৃতীয় বর্ষের কোন ডিপার্টমেন্ট বসেছিল । হাসি জিনিসটা অনেক সময় সংক্রামক, দ্রুতই পুরো দর্শকসারিতে হাসাহাসির রোল পড়ে যায় । ম্যাডামদের একজন স্টেজে উঠে মেয়েটিকে লাইনটি ধরিয়ে দেন । মেয়েটি আবারও গাইতে থাকে । তার কিছুক্ষণ আগের গলার সেই মিষ্টতা নেই, সেখানে স্থান করে নিয়েছে নোনতা ভাঙ্গা সুর । কোনভাবে শেষ করে সে দ্রুত নেমে আসে স্টেজ থেকে । তারপর হারিয়ে যায় ক্যাম্পাস থেকে । সন্ধ্যার কুয়াশা ভেদ করে মার্সিডিস ছুটে চলে ।

রাত প্রায় ১১টা বেজে গেছে । বড় মিলনায়তনের সামনে অনেক মানুষ । অনেকেই হাতে ফ‌োন নিয়ে একটা সেলফি তোলার আশায় আছে, কেউ কেউ আছে ডায়েরির পাতা নিয়ে অটোগ্রাফের জন্য । একদম অল্প কয়েকজন আছে শুধু আহাদকে একটু সামনাসামনি দেখার জন্য । এসবের মাঝে আহাদ চেষ্টা করছে সামনের পার্কিং এ রাখা গাড়ি পর্যন্ত যেতে । কাল তেমন কোন কাজ নেই । বাসায় গিয়ে আরামসে একটু সিনেমা দেখা যাবে রাত জেগে । আহাদ চৌধুরী সৃষ্টিকর্তা সম্ভবত খুব গুটিকয়েক মানুষকে দু’হাত ভরে দেন । আহাদ সে অল্প ক’জনের একজন । বাবার ব্যবসা ছিল, অর্থকষ্ট দেখেনি আহাদ । বাবা-মা দু’জনেই নান্দনিক, প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন । বাসায় হাজারো রকম বই ছিল, বই পড়ার অভ্যেস ছিল । আহাদের পড়াশোনায় মনোযোগ কম থাকলেও মেধা কম ছিল না । মায়ের ইচ্ছায় ছোটবেলা থেকেই গানের চর্চা শুরু হয় । ওস্তাদের তালিমে আহাদ হয়ে ওঠে অসামান্য গায়ক । স্কুল-কলেজের ফাংশন থেকে শুরু করে আজকের এই কনসার্ট । কখনও দর্শকসারি আহাদকে ফিরিয়ে দেয় নি । সে বড় তারকা হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলি থেকে । প্রথমে একটা ফাংশনে গান গায়, তারপর আর পেছনে ফিরতে হয় নি । রাতারাতি ক্যাম্পাসে হিট সে, যে কোন অনুষ্ঠানে তার গান গাওয়া ছিল পুরো ক্যাম্পাসের দাবী । এক ঝাঁক বন্ধুবান্ধব সারাক্ষণ ঘিরে রাখতো তাকে । খুব জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ার তার মধ্যে হয়তো হালকা অহংকারও জন্ম নেয় । সেটা খুব কাছের কয়েকজন ছাড়া কেউ বুঝতো না । মোটামুটি রেজাল্ট নিয়ে যখন সে পাশ করে বের হয় ততদিনে তার দুটো অ্যালবাম বেরিয়ে গেছে । প্রস্তাব আসছে সিনেমার প্লেব্যাকে । বাবা-মা তখন বলেছিলেন যে বাইরে আরও বড় ডিগ্রির জন্য পড়তে যেতে, সে যায় নি । দেশেই গান-বাজনা নিয়ে থেকে গেল । বাবা-মা একসময় বড় বোনের কাছে দেশের বাইরে চলে গেলেন পাকাপাকি ভাবে । সে থেকে গেল নিজের মত করে একা একা । বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করতো, আর গান । কখনো কখনো মনে হতো একা থাকতে কষ্ট হচ্ছে, একটু পরে আবার ভেবে নিত একাই ভাল আছে। সে আসলে কখনো কোন সম্পর্কে জড়াতে চায় নি তা না, ক্যাম্পাস জীবনে গানের খাতিরে অনেকেই তার প্রেমে পড়েছিল, সেও কখনো এর সাথে, কখনো তার সাথে এভাবে প্রেম প্রেম খেলে গেছে । সত্যি কিংবা আসল প্রেম এসেছিল একবার, মেয়েটি ভাল কবিতা লিখতো । এক অনুষ্ঠানে মেয়েটির কবিতা আবৃত্তি শুনে আহাদের মনে হয়েছিল একে ছাড়া সম্ভবত জীবন কাটানো যাবে না । মেয়েটি ফিরিয়ে দেয় তাকে, কিভাবে যেন সে টের পেয়েছিল আহাদের ভেতরের অহংকারী তরুণটির অস্তিত্ব । ক’দিন পাগলামি করে আহাদ একসময় হার মানে । সেই সময়ের পর তার মধ্যে একটা পরিবর্তন আসে । আগের সেই উদ্ধত, দুর্বিনীত আহাদ হয়ে যায় নম্র ভদ্র এক যুবক ।

শীতের সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসটা ডুবে আছে ধূসর একটা চাদরে । শীতকালীন বন্ধ চলছে, বেশীরভাগ ছেলেমেয়ে ক্যাম্পাসে নেই । খালি যাদের টিউশন আছে তারা রয়ে গেছে । এমন সব সন্ধ্যায় জীবনটা অনেক সময় বালু বালু লাগে । যেন মরুভূমির শুষ্ক বালিয়াড়ি, যাতে কোন প্রাণের স্পন্দন টের পাওয়া যায় না । একটা চাঁদ উঠেছে, কুয়াশার চাদরে চাঁদ দেখা যায় না, তবে জোছনা টের পাওয়া যায় । যেন কুয়াশার ধূসর জমিনে রূপালী সুতোর কারুকাজ । মেয়েটি এমনি সন্ধ্যায় বসে ছিল মিলনায়তনের পাশের মাঠে, একা, বেশ ঠান্ডা লাগছে, গায়ে একটা শাল জড়ানো, তারপরও যেতে ইচ্ছে করছে না । সবকিছু খুব এলোমেলো হয়ে গেল, সেদিনের সেই ঘটনার পর সে ঠিক আগের মত হতে পারে নি । একসময় তার মত আশাবাদী, আত্মবিশ্বাসী মানুষ তার আশেপাশের কেউ দেখে নি । মাত্র দ্বিতীয় বর্ষ শুরু হলো পড়াশোনার, এ ক’মাসের ব্যবধানে সে এখন হতাশাগ্রস্ত এক মানুষ । ড্রাইভারকে ফোন দিয়ে জেনে নেয় গাড়ি কোথায় আছে । মাঠ থেকে মেইনরোডটা খানিকটা দূরে, এতটুকু রাস্তাও হেঁটে যেতে ক্লান্ত লাগে । হাঁটতে হাঁটতে চোখে তীব্র আলো এসে লাগে, দূর থেকে মিনিবাসটা এগিয়ে আসে, পা দু’টো থমকে যায়, শেষ মুহুর্তে মনে হয় এই আলো জোড়াই সবচেয়ে আপন । কানে বাজতে থাকে কয়েকশ মানুষের হাসি, হাইড্রোলিক হর্ণের শব্দ তাতে ঢাকা পড়ে যায় । পিচের রাস্তায় রাবারের ঘষে যাওয়ার শব্দ, একটা জোরে ধাক্কা তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে, ততক্ষণে দেরী হয়ে গেছে । কুয়াশার চাদরে মিশে যেতে থাকে পোড়া রাবারের গন্ধ ।

গানের পাশাপাশি আহাদের আরেকটা শখ আছে, সেটা হলো ড্রাইভিং । টাকা পয়সা যা ওড়ায় তা এই গাড়ির পেছনে । এর মধ্যে তিনটে শখের গাড়ি সে কিনে ফেলেছে । ক’দিন আগে কিনলো আরেকটা । এটা আসলে পুরোনো অ্যান্টিক গাড়ি, ১৯৮০ মডেলের মার্সিডিজ ৪৫০এসএল । দেখতে অসাধারণ হয়েছে । পুরোনো গাড়ি হলেও কিছু অদল-বদল আছে । রেডিও বসেছে নতুন, সিট কাভারগুলো বদলানো হয়েছে আর ভেতরের টুকটাক টিউনিং তো আছেই । ধানমন্ডির পুরোনো এলাকায় থাকতেন গাড়ির মালিক । বিক্রির সময় বলেছিলেন অনেকদিন চলে নি গাড়িটা । গাড়িটা আসলে ছিল তার বাবার, বাবার পর তিনি অনেকদিন গাড়িটা ব্যবহার করেছেন, আসলে ঠিক তিনি না । তার এত পুরোনো মডেলের গাড়ি পছন্দ ছিল না, কিন্তু তার মেয়ে খুব পছন্দ করতো গাড়িটা । দাদার আদরের নাতনী চায় নি বাবা গাড়িটা বিক্রি করে ফেলবে । মেয়েই বেশীরভাগ সময় গাড়িটি ব্যবহার করত। আহাদ জানতে চায় তার মেয়ের এত শখের গাড়ি বিক্রী করে দিচ্ছে কেন, উত্তরে যা শুনলো সেটা ঠিক আশা করে নি । ভদ্রলোকের মেয়ে বছর ছয়েক আগে দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেছে, তারপর তিনি অনেকদিন গাড়িটা রেখে দিয়েছিলেন মেয়ের স্মৃতিতে । এখন আর দেশে থাকবেন না, সব গুছিয়ে চলে যাবেন বাইরে । তাই বিক্রী করে দেয়া । ভদ্রলোকের কথা শুনে আহাদ একবার ভেবেছিল কিনবে না গাড়িটা, পরে ভাবলো সে না কিনলে অন্য কেউ হয়তো কিনে নেবে। তারচেয়ে তার কাছেই থাকুক, সে গাড়ির যত্ন করতে জানে ।

গাড়িটা খুব বেশী চালানো হয় নি, ঢাকার রাস্তায় এই গাড়ি চালাতে ইচ্ছে হয় না । কিন্তু চালানোর শখটাও প্রবল, তাই যখন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক অনুষ্ঠানে গান করার আমন্ত্রণ এলো সে ভাবল এটাই সুযোগ, গাড়িটা নিয়েই যাবে । পরিকল্পনা মাফিক সব গুছিয়ে রওনা হয়ে যায় সে । ভদ্রলোক ঠিকই বলেছেন, গাড়িটা খুব যত্ন করে রাখা হয়েছিল । এত পুরোনো গাড়ি এখনও এত ভাল খেল দেখাচ্ছে । হাইওয়েতে মাখনের মত চলছিল । ফুরফুরে মেজাজে প্রোগ্রাম করল, ক্যাম্পাসটা শহর থেকে দূরে, কী মনে করে সে শহরের হোটেলে ওঠে নি । আয়োজকদের অনুরোধ করে রেস্টহাউজে থাকে । প্রোগ্রামের পরদিন সকালে উঠে বৃষ্টিভেজা সবুজ ক্যাম্পাসটা দেখে মনে হয় সিদ্ধান্তটা ভালই হয়েছে । খুব বেশী ছাত্রছাত্রী নেই এখানে, তাই অপ্রয়োজনীয় হইচই নেই । আর শ্রাবণের এই বৃষ্টিভেজা দিনটা যেন আরও নিশ্চুপ । বৃষ্টি যে এত সুন্দর হতে পারে সেটা সে ঢাকায় বসে কখনো বুঝতে পারে নি । সে একটা ছাতা নিয়ে হেঁটে দেখে সবুজ স্বর্গ, ক্যান্টিনগুলোর টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ, হলগুলোর পাশে পুকুরে ফুটে আছে শাপলা, মাটির সোঁদা গন্ধ চারপাশের বাতাসে ভেসে বেড়ায় । রূপালী স্টোর নামে একটা ছোট্ট দোকানে চা খায়, মনে হয় অনেকদিন পর এক কাপ ভাল চা খাওয়া হলো । নিজের অজান্তেই তার কোলাহলময় ক্যাম্পাসের কথা মনে পড়ে । এখানে সেই কোলাহল নেই, আছে প্রকৃতির ভাষা । আজ সকালেই তার চলে যাওয়ার কথা ছিল, কী মনে করে থেকে গেল বিকেল পর্যন্ত । বিকেলে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল, ছাত্রছাত্রীরা খুবই খুশি । তার অমায়িক ব্যক্তিত্ব তাদের মুগ্ধ করেছিল হয়তো ।

গাড়ি নিয়ে বাসায় ফেরার কথা থাকলে মেইন গেট দিয়ে বের হয়ে সে বামদিকে গাড়ি নিয়ে আগায় । মনে হলো পাহাড়ে এমন বর্ষাটা একটু দেখে আসা যাক । রাঙ্গামাটির পথে গাড়ি নিয়ে আগায় সে, পাহাড়ী রাস্তা নিয়ে প্রথমে একটু টেনশনে ছিল । এমন না যে তার এমন রাস্তায় গাড়ি চালানোর অভ্যেস নেই, আসলে নতুন কেনা গাড়িটা এখনও পোষ মানাতে পেরেছে বলে মনে হয় না । অল্প ক’দিন চালিয়েছে মাত্র । তাও সে এগিয়ে যায় । পাহাড়ের দিকে তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামে, তার ওপর আকাশে মেঘ । বৃষ্টি থেমে গেছে, জানালা নামিয়ে দেয়, হু হু করে ভেজা বাতাস গায়ে এসে লাগে । পাশের সিটের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে । মনে পড়ে তার কথা, অহংকারী আহাদকে বদলে দিয়ে যে হারিয়ে গেছে জীবন থেকে । পাশ দিয়ে একটা জীপ চলে যায়, আহাদ বাস্তবে ফিরে আসে । না, পাহাড়ী রাস্তায় অন্যমনস্ক হলে চলবে না । রেডিও চলছিল, হঠাৎ থেমে যায় । ঘরঘর শব্দ হয়, সম্ভবত স্টেশন পাচ্ছে না । সামনে একটা বাসের হেডলাইট দেখা যায়, আহাদ বামে স্টিয়ারিং ঘোরায়, কিন্তু অবাক হয়ে যায়, স্টিয়ারিং ঘুরছে না । বাসটা ক্রমাগত হর্ণ দিতে থাকে, আহাদ বুঝতে পারে না কী করবে । গাড়ি ব্রেক করতে চায়, তাও কাজ হয় না । শেষ মূহুর্তে কীভাবে যেন গাড়িটা বামে সরে আসে । যেন নিজে নিজেই সরে আসলো । আহাদ বিভ্রান্ত হয়ে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে তাকিয়ে থাকে । গাড়িটা চলছে । ঠিকমতই চলছে, সমস্যা হলো গাড়িটা সে চালাচ্ছে না । গাড়ির নিয়ন্ত্রণ তার কাছে নেই । রেডিও ঘরঘর করতে করতে বন্ধ হয়ে যায়, শুধু আসে শোঁ শোঁ শব্দ । তারপর যেন কারও গলা শুনতে পাওয়া যায়

— কেমন আছো আহাদ?

— কে? কে কথা বলে

— আমাকে চিনতে পারো নি?

— না, কে আপনি?

— আপনি করে বলছ কেন আহাদ? তুমি আমার সিনিয়র হবে । তুমি করেই বলতে পারো

— আপনি কে? এখানে কী হচ্ছে?

— ওমা! এখনও চিনতে পারো নি?

— না, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন

— ওমা! আমি একটু গল্প করতে চাইলাম । আর তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছ?

রেডিও থেকে ভেসে আসা নারীকন্ঠ হতাশ হয়েছে টাইপ শব্দ করে । আহাদ দরজা খুলে লাফ দিতে চায়, দরজা খোলে না ।

— কেন এমন করছো? বুঝতে পারছো না যে গাড়ি তোমার কথায় চলছে না?

— আপনি কে? আমার কাছে কী চান?

— দেখো তো, ছেলেটা আমাকে এখনও চিনতে পারে নি । আচ্ছা, একটা ক্লু দেই । তোমার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল সেই ভার্সিটিতে ।

— আমি জানি না, আপনি প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন

আহাদের মেরুদণ্ডের মাঝে দিয়ে ভয়ের ঠাণ্ডা বাতাস চলে যায় । শরীরের প্রতিটা রক্তকণিকায় ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত কোন পরজীবির মত । কাঁপতে থাকে ঠকঠক করে । হৃৎপিন্ডটা ড্রামের মত করে লাফায় । খুব পিপাসা পায়, চিৎকার করতে ইচ্ছে হয় কিন্তু গলা দিয়ে একটা ছোট্ট শব্দও বের হয় না ।এই ভয়ের জন্ম এই পৃথিবীতে না, কোন আদিম কালো অন্ধকারে এর জন্ম । যুগ যুগ ধরে হয়তো লুকিয়ে থাকে । মনে হয় দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠলেই ভয় কেটে যাবে । কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তব হয়ে সামনে চলে আসে ।

— কেন মনে নেই আমাকে? মনে করতে পারছো না কেন?

মেয়েটির কন্ঠে রাগ । গাড়িটা বিপদজ্জনকভাবে একটা বাঁক পার হয় ।

— বিশ্বাস করুন, আমি জানি না আপনি কে । আমি আপনার কোন ক্ষতি করি নি । আমাকে ছেড়ে দিন ।

— ক্ষতি করো নি? তুমি আমাকে এক পলকে ভেতর থেকে গুড়িঁয়ে দিয়েছ । আর বলছো ক্ষতি করো নি?

— আমি জানি না আপনি কী বলছেন, আপনার হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে

— না, আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে । আমায় তুমি যখন তুড়ি মেরে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছ, তখন তোমার কন্ঠ, তোমার হাসি আমার স্পষ্ট মনে আছে

— আমি দুঃখিত, আমি জানি না আমি কী করেছি । আমি দুঃখিত

— আচ্ছা, দুঃখিত হয়ে কী লাভ এখন? যা ক্ষতি করার তো করেই ফেলেছ । তারচেয়ে চলো একটা খেলা খেলি

— আমাকে ছেড়ে দিন দয়া করে

— খেলায় জিতলেই তুমি মুক্ত

— কী খেলা?

— তোমার ভাল লাগবে খেলাটা । আসলে তোমার জন্মই এই খেলার জন্য

— কী খেলা?

— আমি গান গাইব

— প্লীজ আমাকে যেতে দিন

— গানের শেষ অক্ষর দিয়ে তুমি গাইবে

— আমাকে মারবেন না

— তোমার শেষ অক্ষরে গাইব আমি

— আপনি যা বলবেন আমি করবো, কিন্তু আমাকে মারবেন না

— ১ থেকে ১০ গোনার মধ্যে যে গাইতে পারবে না সে হেরে গেল

তারপর রেডিওতে বেজে ওঠে একটা গান । কয়েক লাইন বাজার পরই থেমে গেল, আহাদ বুঝতে পারে না কী হবে । শেষ অক্ষর দিয়ে সে গান শুরু করে । কয়েক লাইন পর থেমে যায়, রেডিওতে আবার গান বেজে ওঠে । কয়েক রাউন্ড খেলা হয় ।

— ওমা! তুমি কত ভাল গান জানো । আর এতক্ষণ কেন নাটক করছিলে?

— আপনি কী চান আমার কাছে?

— গান শুনতে চাই

— গান তো শুনিয়েছি । এখন আমাকে ছেড়ে দিন

— আচ্ছা যাও, এটাই শেষ গান । এবার ঠিকমত পারলে আর জ্বালাতন করব না । ঠিক আছে?

— আচ্ছা

রেডিও আবার বেজে ওঠে,

কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া

তোমার চরণে দিব হৃদয় খুলিয়া

কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া

চরণে ধরিয়া তব কহিব প্রকাশি

গোপনে তোমারে, সখা, কত ভালোবাসি

ভেবেছিনু কোথা তুমি স্বর্গের দেবতা

কেমনে তোমারে কব প্রণয়ের কথা……….

গানটা পরিচিত, মেয়েটার কণ্ঠ চেনা চেনা লাগে আহাদের । আহাদের মনে পড়ে যায় গানটার কথা, মনে পড়ে এই মেয়েটির কথা । আরও অনেক বছর আগে এই গানটিই গাইছিল মেয়েটি । তারপর লাইন ভুলে গিয়েছিল, একটা ছেলে সেই ভরা মজলিসে খুব হাসাহাসি করেছিল মেয়েটাকে নিয়ে । ছেলেটা খুব চেনা তার । গাড়ির হেডলাইটে সামনের একটা মোড় দেখা যায়, মোড়ের পাশে রেলিং কিংবা তেমন কিছু নেই । আহাদ প্রাণপনে মনে করতে চেষ্টা করে কোন একটা গান, মনে পড়ে না ।

গাড়ির গতি বাড়তে থাকে, সবুজ পাহাড়ের খাদ কালো দানব সেজে হাঁ করে এগিয়ে আসে । রেডিওতে গান বাজতে থাকে । শেষ গান ।