ইনানি
প্রারম্ভিকা
শেষ বিকেলের আলো
১০৩৪ সাল, ইনানি রাজ্যের রাজধানী নাফনাফ
রাজা রাইকুন নাফের এই দরবার ঘরটা চমৎকার । পাহাড়ের উপর তৈরী রাজপ্রাসাদটা দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাথরের গায়ে আরেকটা পাথর ঝুলে আছে অলস ভঙ্গিতে । বিশেষ করে সকালের হালকা রোদটা যখন এই প্রাসাদের ওপর পড়ে তখন উচু এলাকা হওয়ার দরবার ঘরের জানালা দিয়ে দক্ষিণের অতল সাগর চোখে পড়ে । বেলা শেষ হয়ে এসেছে । সূর্যের আলো আলতো করে ভেসে আছে অতল সাগরের পানিতে । দু’চারটা সামুদ্রিক পাখি চোখে পড়ে হঠাৎ হঠাৎ । এখান থেকে ইনানির বন্দর দেখা যায় । উত্তমাশার সবচেয়ে বড় বন্দর এই নাফনাফ । সবসময় দু’তিন মাস্তুলের বড় জাহাজ এখানে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বসে থাকে । নাবিকদের মত জাহাজ গুলোরও কোন বিরাম নেই যেন, কেউ নামছে, কেউ উঠছে, মেরামত চলতে থাকে । আজ নিত্যদিনের সেই নিয়মের ব্যতয় হয়েছে । আজও বন্দর ব্যস্ত, তবে সেই ব্যস্ততার উদ্দেশ্য ভিন্ন। রাইকুন নাফ উদাস ভঙ্গিতে সেদিকেই চেয়ে আছেন । বন্দর থেকে সচরাচর শব্দ এই দরবার পর্যন্ত পৌছায় না । তাই আজকের বন্দরের অন্য রকম ব্যস্ততার কোলাহল শোনা যাচ্ছে না ।
চারিদিকে কোলাহল হচ্ছে অবশ্য । সৈনিকদের মরণ চিৎকার, ঘোড়া ডেকে উঠছে, পোড়া কাঠ ফাটার শব্দ, তলোয়ারের ঝনঝনানি, কারও কান্না । কখনও কখনও এদের ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে নিঃসঙ্গ গাংচিলের ডাক ।
এসব কোলাহলে কান নেই রাইকুন নাফের । তার দৃষ্টি পোতাশ্রয়ে রাখা বড় দু’মাস্তুলের জাহাজটার ওপর । জাহাজটার গায়ে আগুন লাগি লাগি করছে । বড় মাস্তুলটার মাথায় একটা পতাকা উড়ছে । গাড় নীলের মাঝে রূপালী ঢেউ, ঢেউ থেকে ভেসে উঠছে রূপালী তিমি । আগুন ধরে গেছে সেই রূপালী ঢেউয়ের কোনায়। তার নৌবাহিনীর জাহাজে আগুন লেগে যাচ্ছে দেখে হতাশ কিংবা চিন্তুিত হওয়ার কথা, রাইকুনের কেমন জানি একটা উত্তেজনা লাগছে মনে । এতে একটু অনুতপ্তও হলেন রাজা । এরই মধ্যে আগুন জ্বলে উঠল । হালকা নীল পালটায় কমলা আগুন দেখে মনে হচ্ছে আকাশের সূর্য নেমে এসেছে এই বন্দরে ।
রাইকুনের মনে পড়ল তার মেয়ের কথা । ছেলেকে পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে ভাবলেও মেয়েকেই তিনি বেশী আদর দিয়েছেন । ছেলেমেয়ে দুটোকে তার স্ত্রী সহ দু’দিন আগেই ইনানি থেকে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি, সাথে দরবারের আরও কয়েকজন সভাসদ, রাজবংশের বিশেষ পাহারাদার বাহিনীর সেনাপতি ও কিছু সৈন্যও আছে । অতল সাগরের ওপারে তার স্ত্রীর ভাইয়েরা থাকে । তারা এতক্ষণে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌছে গেছে সেটাই বিশ্বাস করতে চান তিনি । তাকেও যেতে বলেছিল সবাই, তবে নাফরাজের যে এরকম হারিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই । ২০০ বছর ধরে ইনানি শাসন করা নাফ রাজাদের আজ শোচনীয় পরাজয় । যুদ্ধের শুরুর দিকে রাইকুন ভাবেন নি যে তার পরাজয় হতে পারে । যতই দিন গিয়েছে ততই বুঝেছেন যে আসলে এমনটাই হবার কথা ছিল । আসলে ইনানি আক্রমণ করে দখল করতে পারে এমন সম্ভাবনার কথাই কোনদিন নাফরাজাদের মাথায় আসে নি ।
চাপা অথচ জোরালো শব্দে রাইকুনের চিন্তার সুতো কেটে গেল । দরবার ঘরের প্রধান ফটক কেঁপে উঠেছে আবার । আশেপাশের কোলাহল যেন আরও কাছে পৌছে গেছে, তারপর হঠাৎ করেই কেন জানি সব চুপচাপ হয়ে গেল । ঘন জঙ্গলে শিকারী তেমাথা এগিয়ে আসার সময় চারপাশ ভয়ে যেমন চুপটি করে যায় ওরকম । আরেকবার চাপা শব্দ, ফটক আবার নড়ে উঠল । একপাশের দেয়ালে ঝোলানো বিশাল আয়নাটি ঝনঝন শব্দে ভেঙ্গে পড়ে । দরজার ওপাশে যে অপেক্ষা করে আছে সে তেমাথার চেয়ে কম ভয়ানক নয় ।
মড়মড় শব্দে ভেঙ্গে পড়ল বাশমনি কাঠের ফটক । ধুলো, বালি আর ভাঙ্গা টুকরায় দৃষ্টি আটকে যেতে চায় । কে জানি বলেছিল যে বাশমনি কাঠের ফটক ভাঙ্গা অসম্ভব । রাইকুন আনমনে হেসে ওঠেন । সব ফটকই ভেঙ্গে পড়ে । প্রয়োজন শুধু পর্যাপ্ত ইচ্ছে আর শক্তি । ধুলোর মাঝে অবয়ব ভেসে ওঠে । সারিবদ্ধ অবয়ব দরবার হলের দু’পাশে অবস্থান নেয় । ঠিক সেই সময়ই অতল সাগর থেকে ভেসে আসে একমুঠো পাগলা হাওয়া । সে হাওয়ায় নোনা গন্ধের সাথে মিশে গেছে বারুদ আর রক্তের গন্ধও । ইনানি যে অতলে পতিত হতে যাচ্ছে তারই যেন পূর্বাভাস । দরবারে ধুলো সরে যায় একপাশে, মাঝখানে দাড়িয়ে আছে আগুন্তক।
সম্রাট টিক্কা খান এর চকচকে বর্ম রক্ত আর কাদায় মাখামাখি। হাতে খোলা তরবারি। শিরস্ত্রান খুলে টিক্কা খানতাচ্ছিল্য ভরে তাকালো পরাজিত রাইকুনের দিকে।
রাইকুন, শেষ পর্যন্ত তোমার সাথে দেখা হলো।
নাফ রাজা সিংহাসনে বসে উদাস ভাবে বাইরে বন্দরের দিকেই তাকিয়ে রইলেন।
কী হলো? আমার দিকে ফিরে চাইতেও তোমার ভয় হচ্ছে?
এমন দিনে এত কষ্ট করে এতদূর আসলে খাইখাই। তোমাকে কী দিয়ে আপ্যায়ন করব তাই ভাবছি।
হা হা, তোমার রসিকতার গল্প শুনেছি অনেক। যাক, কষ্ট হলেও এতদূর আসা সার্থক।
নাফ রাজ শ্রাগ করলেন। সম্রাটের চোখে বিরক্তি। মাথা দুলিয়ে ইশারা করতেই দু'জন সৈনিক শক্ত হাতে রাইকুনকে দু'পাশ থেকে ধরে নামিয়ে আনে। হাটুতে আঘাত করে চেপে ধরে বসিয়ে দেয় ঠান্ডা পাথুরে মেঝেতে। ধীর কদমে সম্রাট সিংহাসনে গিয়ে বসেন। গালে এক হাত দিয়ে আরেক হাতে তরবারি মাটিতে স্পর্শ করেন।
সত্যি বলতে তোমাকে এখানে পাবো আশা করি নি। আমি ভেবেছিলাম তুমি পালিয়েছ।
নাফ রাজা নিরুত্তাপ।
তোমার গল্প কিন্তু দিকে দিকে ছড়িয়েছে । কিভাবে তুমি ইনানির বিখ্যাত নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করো। অতল সাগরের কত দস্যু তোমার পতাকা দেখলেই পালায়।
পরাজিতের চোখে কোন আগ্রহ নেই ।
তোমার সৈন্যরা ভালই লড়াই করেছে । তবে দিন শেষে কে জয়ী হলো সেটাই শেষ কথা । কী বলো?
কে জয়ী আর কে হেরে গেল সেটা কী দেখে ঠিক করো সম্রাট? আজ এই সিংহাসনে বসে পড়েছ বলেই তুমি জিতে গেলে?
বাইরে তাকাও নাফরাজ । তোমার পতাকা পুড়িয়ে উড়ছে রক্তলাল তেমাথা ।
রাইকুনের কোন ভাবান্তর হয় না । উদাস ভাবে আগের মতই বসে থাকেন ।
আচ্ছা, বলতেই ভুলে গেছি । তোমার জন্য একজন একটা বার্তা পাঠিয়েছে ।
চোখে খুশী ফুটিয়ে বলতে থাকেন সম্রাট ।
তোমার বন্দর দখল করার আগে বুঝলে, আমার লোকজন মাঝ সাগরে একটা বজরা ধরলো । প্রথমে ওরা ভেবেছিল সাধারণ লোকজন যুদ্ধের ভয়ে সাগর পাড়ি দিচ্ছে, তল্লাশী করার সময়ও তাই ধারণা ছিল । তারপর হঠাৎ করে এক কিশোরীর গলায় রাজপ্রতীক । সব তখন একদম তেহারার জলের মত পরিস্কার হয়ে গেল । হা হা হা
টিক্কা খানের অট্টহাসিতে সিংহাসন কেঁপে ওঠে । সংক্রামণ রোগের মত হাসি ছড়িয়ে যায় দরবার হলের বাইরে দাঁড়ানো প্রহরীর চেহারাতেও । রাইকুনের চেহারায় উদাসিনতা সরিয়ে জায়গা করে নেয় শোক ।
যদিও সৈনিকেরা তোমার রাণীকে একটু রাজকীয়ভাবে খাতির করতে চেয়েছিল, আমি বারণ করেছি । আমার এসব পছন্দ না । তারচেয়ে ঝটপট ঝামেলা মিটিয়ে ফেলাই ভাল । এখন পরিবার আর তাদের সাঙ্গপাঙ্গ সবই অতলের গভীরে ডুবে গেছে । হা হা হা ।
চুপ করো টিক্কা খান
আশ্চর্য, তুমি রেগে যাচ্ছো কেন? আমার তো ধারণা তোমাদের পবিত্র রক্ষক তিমিংগিলের পেটে গিয়ে তাদের জীবন সার্থক হয়েছে । হা হা হা
তোমার সিংহাসন তুমি বুঝে নাও সম্রাট, একদিন আর পালাবার পথ পাবে না
কী বলতে চাও তুমি? তোমার বংশ আমি ডুবিয়ে দিয়েছি । এই সিংহাসন আমার কাছ থেকে কেড়ে নেই এমন কেউ আর নেই, আর যুদ্ধে খান বাহিনীকে হারাবে এমন কোন বাহিনী নেই ।
একদিন সিংহাসনই তোমায় কেড়ে নেবে ।
টিক্কা খানের চোখ তেমাথার আগুনের মতই জ্বলে ওঠে । চোখ দিয়ে ইশারা করেন সম্রাট । ধীর পায়ে এগিয়ে আসে একজন সৈনিক, খাপ থেকে তরবারি হাতে নেয় । শেষ বিকেলের আলো প্রতিফলিত হয় রূপালী ফলায়, রাইকুন শেষবারের মত একবার বাইরে তাকান, তার মুখে ফুটে ওঠে অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি, যেমনটা ফসল ঘরে তোলার পর কৃষকের, যেমনটা ভরপেট খাবার খেয়ে ঘুমোতে যাওয়ার আগের ।
তরবারি নেমে আসে ।
কাটা মাথাটা কন্দুকের মত গড়িয়ে সিংহাসনের পায়ের কাছে এসে থামে, খোলা চোখ জোড়া তাকিয়ে থাকে টিক্কা খানের দিকে । টিক্কা খান চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকেন প্রাণহীন সেই চোখ জোড়ায় । সম্রাট কাতারে কাতারে মানুষ মরতে দেখেছেন, সহস্র উপায়ে মরতে দেখেছেন । নিজ হাতে কত প্রাণ নিয়েছেন সেটা গুনতেও পারবেন না । কিন্তু কখনও মৃত্যুর সামনে কাউকে এরকম হাসি দিতে দেখেন নি । প্রশান্তি, মুক্তির হাসি । সম্রাট ধাঁধাটা ধরতে পারেন না, রাইকুনের পরিবার মরেছে, তার রাজ্য হারিয়েছে, নাফ বংশের কেউ কোথাও বেঁচে নেই । তারপরও কিসের শান্তি? কিসের জন্য তৃপ্তির হাসি?
সৈন্যরা অপেক্ষা করে, সম্রাটের সাম্রাজ্য অপেক্ষায় থাকে, বিজয়ী সম্রাট অপেক্ষায় থাকেন বিজয় মিছিল থেমে যাওয়ার । শুধু শীতল ভুজঙ্গের মত একটা ভাবনা দরবার হলে ভেসে বেড়ায়, কেন হাসছিল মৃত নাফরাজ ।
এই রহস্য ভেদ করতে করতে আরও কিছু বছর পার হয়ে যাবে সম্রাটের । তার ততদিনে?
ততদিনে বড্ড দেরী হয়ে যাবে ।