← Back to Writing

আমি, তুমি ও সে

Short story

প্রবাহ এক্সপ্রেস আজ প্রায় ২ ঘণ্টা লেট । রাত সাড়ে ১১টায় আসার কথা এখন প্রায় দেড়টা বাজে । শেষ রাতের শেষ ট্রেন লেট হলে খলিলের মনে আনন্দ হয়, যাত্রীরা হতাশ থাকে, বাচ্চাগুলো ঘুমে ঢুলুঢুলু করে । হাতের নানা রং এর বড় ব্যাগগুলোর ওজন বেড়ে যায় প্রায় ১০ কেজি । প্লাটফর্মে কুলিদের তেমন একটা দেখা যায় না, খলিল কুলি তখন একটা মাল টানায় ৫০/১০০টাকা করে বাড়িয়ে নিতে পারে । আজ অবশ্য খলিলের আনন্দ হচ্ছে না । এই অঞ্চলে আজ প্রচুর কুয়াশা পড়েছে, কুয়াশায় এক হাত সামনে কিছু দেখা যায় না এমন । এমন কুয়াশায় মাল টানাটানি কোন কাজের কথা না, তাও খলিল অভ্যাসবশত দাঁড়িয়ে আছে ৩ নং প্লাটফর্মের শেষ মাথায় । অবশ্য যাবেই বা কোথায়? স্টেশনেই তার বাড়িঘর । মালগুদামের ওইদিকে ছোট্ট একটা ঝুপড়িতে থাকে খলিল । এই শীতের রাতে ছেঁড়া পলিথিনের ফাঁক গলে হু হু করে বাতাস আসে । জোনাকির ওখানে যাওয়া যেত, তবে আজকে পকেটে পয়সা নাই তেমন । কয়দিন ধরে আয় উপার্জন ভাল না খলিলের । পয়সা না থাকলে জোনাকি বড় খারাপ ব্যবহার করে ।

স্টেশন মাস্টার বলছিল যে ট্রেন প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে, হয়তো আর ১০/১৫ মিনিট । স্টেশনে তেমন কেউ নাই, দু’টো কুকুর কুন্ডলী মেরে এই মাথায় শুয়ে আছে । স্টেশন মাস্টারের ঘরের সামনে দু'জন পাহারাদার ঘুম পাহারা দিচ্ছে, প্লাটফর্মের এদিকে এক বুড়া কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে, নতুন রিলিফের কম্বল । খলিলের মেজাজ খারাপ হয় । শার্টের পকেট হাতড়ে বিড়ি হাতে পায় সে । এই শীতে বিড়ি টানাই আরামের কাজ, বিড়িতে সামান্য গাঁজা মেশানো । লুঙ্গির গোছায় ম্যাচ পায় না খলিল । এখন আবার আগুন কই পায়, রহমত চাচার চায়ের দোকানের সামনে চুলা জ্বলছে বোধহয় । খলিল হাঁটা দেয় স্টেশন ঘরের দিকে, এগুতে গিয়ে দেখতে পায় একটা লাল রং উঠা-নামা করছে । সিগারেট টানছে কেউ, কুয়াশায় ভাল করে কিছু দেখা যায় না । খলিল লোকটার সামনে গিয়ে কাশি দিয়ে আগুনটা চায় । খানিকটা অবাক করে দিয়ে লোকটা নিজেই লাইটার ধরিয়ে দেয় তাকে, লাইটারের কমলা আগুনে চকিতে চোখে পড়ে চেহারাটা । এ এলাকার পরিচিত চেহারা না, গাল ভরা দাড়ি । ডান চোখের কোণা থেকে একটা হালকা কাটা দাগ, প্রায় ঠোঁটের কোণে পর্যন্ত । আগুন নিভে যায়, ধূসর চাদরে ঢাকা আগন্তুক কুয়াশায় আবার হারিয়ে যায় ।

কুয়াশার বুক চিড়ে প্রবাহ এক্সপ্রেসের মাথার টিকলি দেখা যায় হালকা করে, ভেসে আসে ট্রেনের আগমন বার্তা । খলিলের বিড়ি প্রায় শেষের পথে, ট্রেনটা আসতে থাকে ধীরে ধীরে, প্লাটফর্মের অন্ধকার সরতে চায় না ট্রেনের আলোতে । খলিলের পেছনে এসে দাঁড়ায় কেউ একজন, চিকন কিছু একটা চেপে বসে খলিলের গলায়, খলিল ছটফট করতে থাকে, তাও গায়ে জোর পায় না । বাতাসে গাঁজার গন্ধ ছাপিয়ে হালকা কোন একটা আতরের গন্ধ ভাসতে থাকে । ট্রেন অনেক কাছে চলে এসেছে, ফগ লাইটের আলো ছাপিয়ে সবকিছু খলিলের কাছে অন্ধকার হয়ে আসে, রিলিফের কম্বলের মত অন্ধকার গায়ে মুড়িয়ে যাওয়ার আগে খলিল শেষবার দেখে একটা কাটা দাগ, চোখের কোণ থেকে ঠোঁটের কোণে ।

ট্রেন থামে, ক্লান্ত যাত্রীরা কুলিকে খোঁজে । খলিলের কানে সে হাঁকডাক পৌছে না । আতরের গন্ধ ছাপিয়ে কুয়াশায় ভাসে রক্তের গন্ধ ।

২

বাইরে বৃষ্টি থামার নাম নেই কোন, মাঝেমাঝেই বিজলী চমকাচ্ছে । সুমন অন্ধকার রুমের টেবিলের নিচে লুকিয়ে আছে, থরথর করে কাঁপছে । বৃষ্টির মতই চোখের পানি থামার নাম নেই, পানি গড়িয়ে ঠোটে লাগতেই নোনা নোনা স্বাদ লাগে । সম্ভবত গাল কিংবা কপাল কোথাও কেটে গেছে । বৃষ্টির আওয়াজ ছাপিয়ে কান্না আর গালির শব্দ ভাসে, মায়ের কান্না, বাবার গালি । মদ খেয়ে , জুয়ায় হেরে সুমনের বাবা প্রায়ই মাকে মারে । আজ কোন কারণে মারধর বেশী হয়ে যাচ্ছে । সুমন একবার মাকে ধরতে গিয়েছিল, শরাফত মিয়ার ধাক্কায় ছিটকে পড়ে গেছে । দিনের পর দিন মদ, জুয়া, মেয়েমানুষ নিয়ে মেতে থাকা লোকটা কখনও সংসারের দিকে নজর দেয় নি । সুমনের মা প্রায়ই ভাবে যে ছেলেটাকে নিয়ে চলে যাবে অন্য কোথাও, যাওয়া হয় না । বিয়ের পর প্রথম প্রথম ভাবতো ছেলেপিলে হলে লোকটার স্বভাব বদলাবে । না, কোন লাভ হয় নি , বরং দিন দিন বেড়েছে । আজ যদি ঠান্ডা হয় তো কাল অবশ্যই ছেলেকে নিয়ে চলে যেতে হবে । বৃষ্টি এক নাগাড়ে পড়তে থাকে, শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দ । সুমন তখনও টেবিলের নিচে, মায়ের কান্নার শব্দ আর পাওয়া যায় না । শরাফত মিয়ার নাক ডাকছে, ঘুমাচ্ছে ক্লান্ত লোকটা । সুমন আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে । খোলা দরজা দিয়ে শোবার ঘরের আলো দেখা যায় । সুমন শোবার ঘরে ঢুকতেই দেখে মা শুয়ে আছে মেঝেতে । খুব শান্ত ভঙ্গিতে, যেন কোন কষ্ট নেই মানুষটার । খাটে শুয়ে আছে শরাফত মিয়া, খাটের পায়ের কাছে চকচকে একটা ছুরি, এই ছুরি দিয়ে মা মাঝে মাঝে ফল কেটে দিত । সুমনের কি যেন হয়ে যায়, হাতে তুলে নেয় ছুরিটা । শরাফত মিয়ার বুকগলা নিঃশ্বাসের সাথে ওঠানামা করে । চকচকে ছুরিটা নেমে আসে বুকের ওপর, ধারালো ফলাটা হালকা চাপেই বসে যায় অনেকটা । শরাফত চেষ্টা করে নিঃশ্বাস নেয়ার, ধাক্কায় সুমন আর ছুরি ছিটকে যায় । টলতে টলতে পড়ে যায় শরাফত । তারপর আবার সব সুনসান, খোলা জানালা দিয়ে আসা বৃষ্টির পানি আর লাল রং মিশে যেতে থাকে ।

পরদিন মামা এসে নিয়ে যায় সুমনকে, সে মনে করতে পারে না কী হয়েছিল গতরাতে । পত্রিকায় খবর আসে মদ্যপ স্বামীর সাথে ধস্তাধস্তিতে স্বামী-স্ত্রী দু'জনের মৃত্যু । ৮ বছরের সুমনের মনে থাকে না সে খবর ।

৩

নদীর পাড়ে বড় পাকুড় গাছের নিচে বসে আছে সৈকত । শীতের কনকনে বাতাস এখানে যেন আরও খোঁচায় । ভাল লাগে না তার কিছু, সে প্রায়ই ভাবে যে তার কোন মানসিক সমস্যা আছে । জীবনের অনেক কিছুই সে মনে করতে পারে না সবসময় । সে মাস্টার্স শেষ করেছে ফিজিক্সে, কিন্তু কোন ইউনিভার্সিটি থেকে সেটা তার মনে পড়ে না । তার বাবা-মা ছোটবেলায় দুর্ঘটনায় মারা যায়, সেটা মনে আছে কিন্তু তাদের নাম-চেহারা মনে নেই । একদিন এলিফ্যান্ট রোডের এক চুড়ির দোকানে মায়াবতী এক মেয়েকে দেখে খুব চেনা মনে হয় সৈকতের । সে কাছে গিয়ে জানতে চায় “আচ্ছা, আপনার নাম কি অতসী?” মেয়েটা খুবই চমকে যায়, তাড়াহুড়ো করে মাথা নেড়ে না বলে বেরিয়ে যায় দোকান থেকে । মেয়েটা না বললেও সৈকত জানে যে সে অতসী ছিল । কিন্তু অতসীকে সে মনে করতে পারে না।

অতসীকে মনে না পড়লেও কক্সবাজারের সে লোকটাকে সৈকতের মনে পড়ে মাঝেমাঝে । লোকটার পেছনে দু' তিন মাস ঘুরেছিল সৈকত । বাজারে দোকান ছিল লোকটার, টাকা-পয়সাও খারাপ ছিল না । লোকে বলত সে নাকি কী সব নেশার ব্যবসা করত লুকিয়ে লুকিয়ে । হাসিখুশি মানুষটার বাসায় ছিল ছোট্ট একটা মেয়ে আর বউ । তারপর একদিন ফাল্গুনের রাতের আঁধারে সে হাসি হারিয়ে গেল । জীবনানন্দের কবিতার লোকটা জোছনায় কোন ভূত দেখে শুয়েছিল লাশকাটা ঘরে । আর এই কক্সবাজারের রইসউদ্দীনের দেখা হয়েছিল সৈকতের সাথে । প্রায়ই রাতে রইসউদ্দীন উত্তরপাড়ায় সোহাগীর কাছে যেত । বাসায় ফেরার জন্য বের হতে হতে প্রায় সাড়ে এগারোটা । সেদিন একটু নির্জন রাস্তা ধরে যাচ্ছিল রিকশাটা, চাঁদ মেঘে ঢেকে যেতে রিকশা সাইড করিয়ে রিকশাওয়ালা আড়ালে চলে যায় প্রকৃতির ডাকে । কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে রইসউদ্দীন বিরক্ত হয়ে রিকশা থেকে নেমে রিকশাওয়ালাকে খোঁজে, আশেপাশে কেউ নেই । রইসউদ্দীন কোমরে গোজা চাকুতে হাত দেয়, ভয়ডর তার কম । হঠাৎই রইসউদ্দীনের গলায় চেপে বসে চিকন অথচ ধারালো কিছু । না দেখেই চাকু পেছন দিকে চালায় সে, নাগাল পায় না কারও । চাঁদ মেঘ ছেড়ে আবার উঁকি দিতে দিতে রইসউদ্দীনের শেষ জোছনা দেখা হয়ে যায় । নোনা বাতাসে রিকশার পেছনের পর্দা দুলে, রিকশাওয়ালার তাতে ভাবান্তর হয় নি । যে যাত্রীর অপেক্ষায় ছিল সে গত দু'সপ্তাহ, সে যাত্রীকে গন্তব্যে পৌছে দেয়া হয়েছে ।

সৈকতের সব মনে পড়ে, মনে পড়ে না সে এই উত্তরবঙ্গের জেলায় কবে আসলো সেটা ।

৪

জানালা হয়ে কুয়াশা মাখা কমলা রোদ সুমনের চোখে খেলা করে, আড়মোড়া ভেঙ্গে ঘুম থেকে ওঠে সে । একটু মনে করতে হয় সে কোথায়, নতুন জায়গায় এসে পড়লে প্রথম প্রথম এরকম লাগে । এ বাসাটায় সে এসেছে দু'মাসের মত, বাসাটার বড় সুবিধা হচ্ছে শোবার ঘরের সাথেই বড় একটা বারান্দা । ঢাকা শহরে এমন বারান্দা আজকাল দেখা যায় না । সুমন একটা রকিং চেয়ার বসিয়ে নিয়েছে বারান্দায়, অবসরে বসে থাকবে বলে, যদিও তার অবসর খুবই কম তাও স্বপ্ন দেখতে তো আর দোষ নেই । সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় এসে স্বপ্নের কথাই ভাবতে থাকে সে । গতকাল সন্ধ্যার পর বাসায় এসে একটু ঘুমিয়েছিল, ক্লান্ত ছিল বলেই হয়তো এক ঘুমে রাত কাবার । রাতে খাওয়াও হয়নি, সুমন আশ্চর্য হয় এই ভেবে যে খিদে পায় নি এখনও । শীতের একটা বড় রাত এভাবে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিল, কোন একটা স্বপ্নও দেখলো না সে? কে জানে, ক্লান্ত ছিল হয়তো ।

সিগারেটটা শেষ হওয়ার পর সুমন এক, দুই এভাবে গুনতে থাকে, পঞ্চাশ পেরুতেই মোবাইল খেঁকিয়ে ওঠে । নিজের সাথে সুমনের এই এক পুরোনো খেলা, সকালে সে দেখতে চায় মোবাইল বাজতে কতক্ষণ লাগে । প্রায়ই একশ বা দেড়শ পর্যন্ত যেতে পারে । আজ বোধহয় কপাল বেশী খারাপ । ফোন ধরতেই সহকারী অনিমেষের গলা, স্যার, একটু আসতে হয় যে

— কী সমস্যা অনিমেষ?

— স্যার একটা ডেডবড়ি পাওয়া গেছে

— কোথায়?

— রেলস্টেশনে স্যার, প্লীটফর্মের পাশের লাইনের ওপর

— সুইসাইড নাকি?

— হতে পারে স্যার, খবর নিতে হবে ।

— তো নাও, সমস্যা কী? আর হোমিসাইড কেইস আমরা তো দেখার কথা না

— স্যার ভিকটিম হচ্ছে স্টেশনের খলিল সুমন পুলিশের নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্টে ডিটেকটিভ সার্জেন্ট হিসেবে আছে আজ প্রায় দু'বছরের বেশী হলো । দেশের ভেতরের রুট ধরে কিছু দুস্প্রাপ্য মাদক চোরাচালান হয় অনেকদিন ধরে । সুমন এইরকম একটা অপারেশন নিয়ে লেগে আছে আজ প্রায় অনেকদিন । ছ্যাঁচড়া কয়েকজন মাঝেমধ্যে ধরা পড়লেও বড় বড় গুটি তেমন ধরতে পারে নি তারা, কখনো প্রমাণ হাতে ছিল না, কখনো সন্দেহভাজন লোকটা আগেভাগেই টের পেয়ে ছায়ায় মিলিয়ে গেছে । নানা জেলায় নানা সময় সুমন পোস্টিং নিয়ে কাজ করছিল, সম্প্রতি এসেছে এখানে পোস্টিং নিয়ে । তার পোস্টিং অর্ডার হয় সাদামাটাভাবে, ডিপার্টমেন্টের খুব কম লোকই জানে সুমনের আসল মিশন । এখানে অনিমেষ আর জেরিন নামে দু'জন তার সহকারী । অনিমেষ সে এই ডিপার্টমেন্টে জয়েন করার পর থেকেই তার সাথে কাজ করছে, আর জেরিন মূলত ঢাকায় সেন্ট্রাল টিমে ছিল, ফরেনসিক, আইটি এসব তার স্পেশালিটি, এবার যখন সুমন আর অনিমেষ এখানে ট্রান্সফার হয়ে আসলো তখন সেও আ্যপ্লিকেশন করে চলে আসছে । তাদের কাছে তথ্য ছিল এখানে একজন মোটামুটি মাঝের দিকের চ্যানেলের লোক আছে, যে জিনিস জমা করে আবার সুযোগ মত পাচার করে দেয় । এই জোনের হিসাব-কিতাব তার কাছে থাকে, এন্ড পয়েন্টের সবকিছু সে কন্ট্রোল করে । সমস্যা ছিল একটা যে কেউ তার চেহারা চেনে না । কয়েকটা সূত্র আর দু'জন ছোট মাছ ধরা পড়ে লোকটার যে বর্ণনা দিয়েছিল তাতে সুমনদের সন্দেহ হয় খলিলকে নিয়ে । খলিল রেলস্টেশনে এসে হাজির হয় প্রায় বছরখানেক আগে, ভবঘুরে খলিল ছাপরা ঘরে থাকে, কুলিগিরি করে বেড়ায় । কেউ তাকে সন্দেহ করার কথা না, সুমনরা সন্দেহ করলেও কোন প্রমাণ পায় নি । তাই তাদের পর্যবেক্ষণে ছিল খলিল, সেই খলিলকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে । সুমনকে বের হতেই হয়, তার যাওয়ার কথা না । তবে নতুন আসা অফিসার হিসেবে একটু নাক গলালে হয়তো কেউ কিছু ভাববে না । দ্রুত জ্যাকেট বের করে রেডি হয়, রেডি হওয়ার সময় একটা ব্যাগ দেখে একটু অবাক হয় সে । এটা তার ব্যাগ সেটা মনে আছে, তবে এটায় করে কী নিয়ে এসেছে মনে পড়ে না । আর এতদিনে ব্যাগটা খুলে দেখে নি সে? যাই হোক এসে পরে দেখা যাবে এসব । জেলা শহরের শেষ মাথায় সুমন বাসা ভাড়া নিয়েছে, এখানকার অফিসের একজনই খুঁজে দিয়েছে বাসাটা । মোটামুটি জায়গার ওপরে দোতলা বাসা, নিচের তলায় এক বয়স্ক দম্পতি থাকেন । ওনাদের ছেলে-মেয়ে থাকে দেশের বাইরে, খালি পড়ে থাকা দোতলা তাই ভাড়া দিয়েছেন । সুমন গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যায়, এখান থেকে স্পটে যেতে আধঘন্টার বেশী লাগে না ।

স্টেশনে বেশ ভীড়, পুলিশের হিমশিম খেতে হচ্ছে ভীড় সামলাতে । উৎসাহী লোকজন আছে, আরও আছে যাত্রীর আসা-যাওয়া । সুমনকে দেখে কনস্টেবলরা ঠেলেঠুলে মানুষদের সরিয়ে দেয়, অনিমেষ আগেই পৌঁছে গেছে । ডেডবড়ি খুঁটিয়ে দেখে ওরা, পেটের মাঝ বরাবর দু'টুকরো হয়ে গেছে, মাথাটাও আলাদা হয়ে আছে ।

— কী মনে হয় অনিমেষ? সুইসাইড?

— হতে পারে স্যার, কিন্তু সুইসাইড করার কারণ কী?

— তা এখনও জানি না আরও কিছু বলার আগেই স্থানীয় থানার ওসি সাহেব এগিয়ে আসে,

— এটা স্যার সুইসাইড না

— কী বলেন ওসি সাহেব? খলিলকে খুন করেছে বলতে চাচ্ছেন?

_না স্যার, সেটা না । খলিল আসলে মাঝেমধ্যেই নেশাটেশা করতো, আমার মনে হয় কালও নেশাটেশা করে টাল সামলাতে না পেরে ট্রেনের সামনে পড়ে গেছে ।

— আপনার মনে হলে তো হবে না ওসি সাহেব, তথ্য প্রমাণ কী বলে দেখা লাগবে । আর নেশা করতো বললেন, কীসের নেশা জানা আছে?

— ওই তো স্যার, গাঁজা । মাঝেমধ্যে বাংলা মদ

— এসব ছাড়া এখানে আর কিছুর উপদ্রব নাই?

— মাঝেমধ্যে ইয়াবা ধরা পড়ে, তবে সেগুলো দামী জিনিস । এখানকার মানুষ সেসব খায় না, সেসব অন্য বড় পার্টির কিংবা পাচারের সময় ধরা পড়ে

— হুম, লাশ ময়নাতদন্ত করা দরকার

— লাভ কী স্যার? ভিকটিমের ডেডবডির কোন দাবীদার নাই । নেশা করে পড়ে গেছে ট্রেনের নিচে, কোন মামলা নাই । শুধু শুধু ময়নাতদন্ত করে কী হবে?

সুমন বুঝতে পারে এখন সে ময়নাতদন্ত করাতে চাইলে আসলে ওসিকে সব খুলে বলতে হবে । কিন্তু সেটা করা বিপদ, কে কোথায় কার চর হিসেবে ওৎ পেতে আছে জানা নেই এখনও । কোন রকম তদন্ত করতে হলে সেটা নিজেদের মধ্যেই রাখতে হবে । সুমন আরেকবার ভাল করে দেখে, মাথাটা গলার যে পাশ থেকে কাটা পড়েছে ট্রেনে তার একটু ওপরে আরেকটা দাগ, যেন চিকন অথচ ধারালো কিছু দিয়ে গলাটা চেপে ধরা হয়েছিল । এরকম সে আগে দেখেছে আরেকবার, কক্সবাজারে রইসউদ্দীনের লাশে এরকমই একটা ক্ষত ছিল, সেদিন মনে হয়েছিল ওখানকার কোন ডাকাত গলায় ক্ষুর চালিয়েছিল, আজ মনে হচ্ছে চিকন কোন ধারালো সুতা কিংবা তার জাতীয় কিছুর দাগ ।

৫

সুমন হতাশ হয়ে ডেস্কে বসে আছে, পা তুলে রেখেছে পাশের খোলা জানালায় । সিগারেট টানছে চোখ বন্ধ করে, অফিসে সিগারেট খাওয়ার নিয়ম নেই । সুমন অবশ্য অত তোয়াক্কা করে না । ডেস্কের সামনের দু'টো চেয়ারে বসে আছে জেরিন আর অনিমেষ । কিছুক্ষণ পর সুমন কথা বলে

— কী ভাবছো তোমরা?

— স্যার, মনে তো হয় ওসি সাহেবের কথা ঠিক

— জেরিন, তোমারও একই ধারণা?

— স্যার আমি স্পটের অনেকগুলো ছবি তুলেছি, আরেকটু ভাল মত

দেখে বলতে হবে

— হম, দ্রুত রেডি করো ওগুলা । অনিমেষ, স্টেশন এরিয়ায় কারও

চোখে অস্বাভাবিক কিছু পড়েছে?

— স্যার ওসির লোক তো এসব খোঁজ নেয় নাই, আমি নিজে যাব

আশেপাশে একটু বাড়ি দিয়ে দেখতে

— হুম, থাক তোমার দরকার নাই । আমিই যাব, অফিশিয়ালি এটা

আমাদের হাতে না । সো যা করার সব একটু আড়ালে রেখে

করতে হবে ।

অনিমেষ, আমাদের এরকম আরও একটা পুরোনো কেইস আছে

কক্সবাজারের রইসউদ্দীন । ওটার ফাইল দেখে এটার সাথে কোন

কানেকশান পাও কিনা দেখো । জেরিন তুমি ছবি গুলো রেডি

হলে আমাকে সাথে সাথে জানাবে, আর এখানে খলিলের মারা

যাওয়ার কারণে কারও লাভ হয় কিনা সেটা খোঁজ নাও

— ওকে স্যার দু'জনেই রুম থেকে বেরিয়ে যায়, জেরিন দরজা ভিড়িয়ে দেয়ার ছলে একবার ভেতরে তাকায় অবশ্য । জেরিন মেয়েটা দেখতে বেশ । ঢাকার মেয়ে, ওখানেই হেড অফিসে ভাল ছিল । ফিল্ড ওয়ার্কে অভিজ্ঞতা কম, তাও এখানে কেন আসতে চাইলো আর হেড অফিসও বা কেন অ্যাপ্রুভ করলো কে জানে । অনিমেষ এখানে সরকারী কোয়ার্টারে উঠলেও জেরিন আলাদা একটা বাসা নিয়েছে । সুমনের ভাল লাগে জেরিনকে, তবে পেশাদারী কারণে কখনও এটাকে প্রশ্রয় দেয় নি । যাই হোক, সিগারেট শেষ করে বের হয় সুমন, স্টেশনে পৌছে যায় গাড়ি নিয়ে ।

স্টেশনে একটা চায়ের দোকান, সামনের বেঞথ্চিতে বসে চায়ের কথা বলে সে । সাথে সিগারেট ধরায়, দোকানে এখন লোকজন কম । এসময় ট্রেন নেই \

— চাচা, গতকাল রাতে শুনলাম একজন মারা গেছে । চিনতেন

তাকে?

— হ, খলিল । এইহানে মাল টানতো

— থাকতো কই?

— স্টেশনের লগেই, ছাপড়ায় ।

— একা থাকতো? সাথে কেউ ছিল না?

— হ

— তার সাথে কারও ঝামেলা ছিল? বলতে পারেন?

— আমি তো হুনি নাই, গাঁজা খাইতো । কারও লগে ঝামেলা আছে

তো জানতাম না ।

— হুম, গতকাল সন্ধ্যার পর স্টেশন কাউকে দেখছেন? যাকে আগে

কখনও দেখেন নাই? বা আলাদা করে চোখে পড়ছে কিছু?

— ওইরকম চোখে পড়ে নাই কিছু । তয় রাইতে একজন দোকানে

চা খাইতে আসছিল

— ঢা তো অনেকেই খাইতে আসে, তার কথা বলতেছেন কেন?

— ওই লোকে সুইচ সিগারেট খুঁজছিল, এই সিগারেট এদিকে কেউ

খায় না । তাই আমার কাছে ছিল না

— ওই লোকের চেহারা মনে আছে?

— না, মাফলার গায়ে ছিল, লাল-কালা মাফলার । লম্বা চওড়ায়

আপনাগো মতই হবে ।

সুমন আর তেমন কিছু বের করতে পারলো না ।

ঙ৬.

৬

বিকেল থেকে খুব বৃষ্টি । পাহাড়তলীর চালের আড়তে তেমন ক্রেতা নেই । শিকদার মিয়া তার চালের দোকানে বসে থাকে । সাধারণত সে এতক্ষণ দোকান খোলা রাখে না । আজ একটু ঝামেলা ছিল । শিকদার মিয়া ক্যাশে বসে টাকা পয়সা হিসেব করতে থাকে । বৃষ্টি থামার কোন নাম নেই । তার বাসা বেশী দূর না, পুলিশ বিট, লাকি হোটেলের পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে ১০ মিনিট । দোকানের সামনের ছাউনিতে একজন লোক এসে দাঁড়ায়, সারা শরীর বৃষ্টিতে ভেজা, গায়ে চাদর । শরীর থেকে সস্তা বিড়ির গন্ধ আসছে । একবার তার দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাশে হাসি দেয় ।

— বহুত ঝড় ফরের আজিয়া বদ্দা, শিকদার কিছু বলে না । হিসাব করা শেষ, কর্মচারীদের দোকান বন্ধ করতে বলে । আড়তের ভেতরে লাল-সাদা বেড়ালটা নিঃশব্দে হেঁটে বেড়ায়, শিকার যেন টের না পায় । বেড়ালটার একটা কান অর্ধেকটা কাটা, তাতে তার ইদুরের হালকা শব্দ শুনতে সমস্যা হয় না । আড়তে ইদুরের কল বসানো থাকে, ইদুর ধরা পড়ে না । বেড়ালটাই বরং ইদুর মেরে দেয় । শিকদার ছাতা নিয়ে নেমে পড়ে, রাস্তায় দু' একটা রিকশা চলে, কেউ যাবে না পুলিশ বিট । সে হাঁটা দেয় । পেছনে একবার তাকায়, দোকানের শাটার নামছে ঝনঝন করে, বেড়ালটা স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে, চাদর পরা মানুষটা নেই, লাকি হোটেলের পাশ দিয়ে শিকদার হেঁটে যায় । পেছনে নিঃশব্দে হাঁটছে কেউ, বেড়ালের মত, শিকার যেন টের না পায় । কাছেই কোথাও একটা বাজ পড়ে, বিদ্যুতের আলোয় দেখা যায় একটা কাটা দাগ, গালের একপাশে । শিকদার হঠাৎ তীব্র বিড়ির গন্ধ পায়, ঘাড়ের কাছে কেউ নিঃশ্বাস ফেলে, তারপর গলায় চেপে বসে কিছু একটা, হাত থেকে ছাতা পড়ে যায়, শিকদার চাদরের একটা কোণা খামচে ধরে, তাতে কোন লাভ হয় না । ধীরে ধীরে বৃষ্টি কমে আসে । বেড়ালটা শিকার শেষে চালের আড়তের অন্ধকারে ঘুমিয়ে পড়ে । দূরে চাদর গায়ে সৈকত হেঁটে যায়, কোথা থেকে হেঁটে এসেছে, কোথায় যাবে । মনে পড়ে না ।

৭

অনিমেষ নানা ফাইল ঘেটে কয়েকটা খটকা পেয়েছে, গত দু'বছরে ৮ বার তাদের নজরে থাকা সন্দেহভাজন বড় বড় দাবার গুটি অপঘাতে মারা গেছে, বেশীরভাগ সময়ই মনে হয়েছে স্থানীয় ছিনতাইকারী বা সন্ত্রাসীদের কাজ । কয়েকটার তদন্তে তাদের টিম থাকলেও তেমন কিছু পায় নি । সমস্যা হচ্ছে এই ভিকটিমগুলো যে মাদক নিয়ে কাজ করছে এটা ডিপার্টমেন্টের খুব কম মানুষ জানতো । প্রভাবশালী আর দুর্নীতিগ্রস্ত কারও কারণে যাতে মিশনটা ভেস্তে না যায় তাই যথাসম্ভব গোপনে এই মিশন চলছে । এর মধ্যে তিনটা ঘটনা একটু অন্যরকম, কক্সবাজারের রইস, চট্টগ্রামের শিকদার আর এখানকার খলিল । এরা যে সন্দেহভাজন বা এদের উপর নজর রাখা হচ্ছে এটা জানতো শুধু সুমনের টিমের লোক । তবে কি এদের কেউই খবর বাইরে পাচার করে দিচ্ছে? সে স্টেশনের মেইন ঢোকার রাস্তার দিকে থাকা একটা দোকানের সিসিটিভির ফুটেজ পেয়েছে, সেগুলো সুমনকে মেইল করে দিয়েছে । অনিমেষের মাথা কাজ করে না, জেরিনকে অফিসে দেখল না সে । সুমনকে ফোন দিচ্ছে কয়েকবার, কিন্তু ফোনে পাওয়া গেল না।

জেরিন বিকেল থেকেই সুমনকে খুঁজছে ফোনে, সুমন স্যার কোথায় গেছে কে জানে । ছবিগুলো পাওয়া গেছে, জেরিন নিয়ে এসেছে সব বাসায় । জেরিনের মনে হচ্ছে এটা খুনই, গলায় ধারালো কোন কিছুর আঘাত আছে । সুমনের জন্য জেরিনের চিন্তা হতে থাকে, লোকটাকে সে কতদিন ধরে পছন্দ করে, সুমন গাধা এত টাইম বোঝে, এটা বোঝে না । সুমনের জন্যই সে ট্রান্সফার নিয়ে এ এলাকায় চলে এসেছে । এসব ভাবতে ভাবতেই সুমনের ফোন,

— জেরিন, কী খবর?

— স্যার ছবিগুলো রেডি । আপনাকে সেই কখন থেকে কল দিচ্ছি। সুমনের মনে পড়ে না সে কোথায় ছিল, স্টেশন থেকে বের হয়ে সে কোথায় গিয়েছিল? দুপুরে কী খেয়েছে? কিচ্ছু মনে করতে পারে না সুমন ।

— ইয়ে মানে বিজি ছিলাম একটু । ছবি রেডি তাহলে?

— জ্বী স্যার, আমি নিয়ে আসবো আপনার বাসায়?

কথা শেষ করেই জেরিন চমকে যায়, এটা বলা কি ঠিক হচ্ছে? স্যার কী ভাববে?

— নিয়ে আসবে? আসো, আমি বাসায় আছি ।

চ.

৮

সুমন বারান্দায় বসে আছে, কুয়াশায় দৃষ্টি খুব বেশী দূর যায় না, তার মাথা ভর্তি কুয়াশা । কী হয়েছে তার? দুপুর থেকে সে কোথায় ছিল? মনে নেই কেন? তার মনে পড়ে সকালে একটা ব্যাগের কথা । ওই ব্যাগটা তার, কিন্তু সে আনে নি ঢাকা থেকে । নাকি এনেছে এখন মনে পড়ছে না । ব্যাগে আছে কী? ভাবতে ভাবতেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ । জেরিন এসেছে, অফিসের বাইরে হঠাৎ তাকে দেখে অসম্ভব সুন্দর লাগছে । সুমন লজ্জা পায়, সে কেন বলল জেরিনকে আসতে? জেরিন হয়তো সিনিয়রের কথায় চলে এসেছে, কিন্তু কী না কী ভাববে ।

— জেরিন, তুমি এক কাজ করো, ছবিগুলো রেখে চলে যাও । রাত

হয়ে যাচ্ছে

— প্রথমবার আপনার বাসায় এলাম, কিছু না খেয়ে চলে যাবো?

— তাই তো, চা খাবে? চা বানাই

— আপনি বসুন, আমি বানাচ্ছি ।

চা খেতে খেতে দু'জন গল্প করতে থাকে । গল্প করতে করতে জেরিন চুলায় খিচুড়ি বসিয়ে দেয়, সুমনও ডিম ভাজে ।

— জেরিন, চলো তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসি । রাত হয়ে গেছে

— হোক না, রাত বাড়ে, উঠানের নিমগাছের পাতা গলে কুয়াশামাখা জোছনা গলে পড়ে মাটিতে । ঘটনাস্থলের ছবির খাম পড়ে থাকে টেবিলে, বেসিনে পড়ে থাকে চায়ের কাপ ।

মধ্যরাতে সুমনের ঘুম ভেঙ্গে যায়, জানালা গলে জোছনা এসে পড়েছে খাটে, জেরিনের খোলা পিঠে জোছনা খেলা করে । সুমনের লজ্জা হয় । সিগারেট নিয়ে সে টেবিলে বসে, ছবিগুলো বের করে । ল্যাপটপ খুলে সিসিটিভির ফুটেজ নিয়ে বসে, মাঝরাতে ক্লু নিয়ে তার মাথা ভাল কাজ করে । ছবিতে দেখে লাশের পাশে সুইচ সিগারেটের ফিল্টার, তার মানে হয়তো চায়ের দোকানের সেই অচেনা লোকটাই জড়িত । ঘাটতে ঘাটতে টের পায় সিগারেট শেষ । সিগারেটের খোঁজে ড্রয়ার, ব্যাগ ঘাটাঘাটি করে সুমন, নেই কোথাও । তারপর কী মনে করে ওই ব্যাগটা নেয়, ওইসময় জেরিন চলে আসাতে আর দেখা হয় নি ।

ব্যাগটায় কিছু অদ্ভুত জিনিস, একটা লাল-কালো মাফলার, চাদর, সিগারেটের প্যাকেট, সুইচ সিগারেট । সুমন ঝড়ের বেগে ল্যাপটপ খোলে, সিসিটিভির ফুটেজগুলো দেখে, একটা ফুটেজে দেখে চাদর গায়ে এক লোক স্টেশন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, যেতে যেতে একবার চাদর নামায় সে, সিগারেট ধরানোর সময় চেহারার একপাশে লম্বা কাটা দাগ দেখতে পায় সে ।

উদভ্রান্ত সুমন বাথরুমের বেসিনে গিয়ে পানি দেয় মুখে । আয়নায় চেনা মুখ, মুখের একপাশে চোখের কোণ থেকে ঠোঁটের কোণ পর্যন্ত হালকা কাটা দাগ ।

পরদিন জেরিন ঘুম ভেঙ্গে সুমনকে দেখে না । একটা ছোট চিরকুটে লেখা সে কাজে বাইরে বের হচ্ছে । জেরিন যেন দরজা ভিড়িয়ে যায় । দুপুরে অফিসে গিয়ে জেরিন শুনতে পায় সুমন নাকি রেজিগনেশন জমা দিয়েছে ।

পরিশিষ্ট

সিলেটের উপশহরে একটা মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্র যেখানে মানসিক অসুস্থ রোগী যারা অসুস্থতার সময় নানা অপরাধ করেছে তাদের চিকিৎসা দেয়া হয় । এখানে ২০৮ নাম্বার রুমে থাকে সৈকত, তার অনেককিছুই মনে পড়ে না । খালি মনে পড়ে কয়েকটা মৃতদেহের কথা ।

প্রতিষ্ঠানের সামনের চত্বরের পুকুরের পাড়ে প্রায় বিকালে সুমন বসে থাকে । তার অনেককিছুই মনে পড়ে, মনে পড়ে না রইস, খলিল কিংবা শিকদারের কথা ।