← লেখালেখিতে ফিরে যান

প্রতিবিম্ব

ছোটগল্প

ঘুম থেকে উঠতে সাধারণত খুব একটা কষ্ট হয় না আমার । অ্যালার্মের শব্দ পেলেই ঘুম ভেঙ্গে যায় । কখনও কখনও একটু আগেও ভাঙ্গে । আজও সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নামলাম । শীতটা ইদানীং ভালই পড়ছে, চাদরে ঠিক মানতে চায় না । আজ নাস্তা বাইরেই করতে হবে কিংবা নিজে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে । অন্য সময় মাইশাই সব করতো, দু’দিন হলো সে বাবার বাড়িতে । উইকএন্ড শেষে আজ অফিস করে বোধহয় বাসায় চলে আসবে । অবশ্য আমার ধারণা আজ ছুটির দিন থাকলেও সে চলে আসতো । বিয়ের পর মেয়েরা নাকি বাবার বাড়ি গেলে আসতে চায় না, আর মাইশা দু’দিনের বেশী থাকতে চায় না ওখানে । কেন কে জানে ।

হাই তুলতে তুলতে ড্রয়িং রুমে আসতে একটু হোঁচট খেলাম । কাউচের পাশের ল্যাম্পটা জ্বলছে, এই বাসায় সবকিছু গোছানো থাকে । ল্যাম্প জ্বলার কথা না । তার চেয়ে বড় কথা কাউচে গুটিসুটি মেরে একজন ঘুমিয়ে আছে । গায়ে ছাই রঙা চাদর, হাতের মাঝে একটা বই । বোঝা যাচ্ছে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিল । বইয়ের নামটা পড়া যাচ্ছে, “Assassin’s Apprentice” । ড্রয়িং রুম বই পড়ার জায়গা না, এ বাসায় আলাদা স্টাডি রুম আছে বইয়ের মোটামুটি সংগ্রহ নিয়ে । এসব কিছুতে আমি হোঁচট খাই নি । হোঁচট খেয়েছি ঘুমিয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে । কাউচে আসলে যে মানুষটা ঘুমিয়ে সে আমার মতো দেখতে পুরোপুরি । না, দেখতে আমার মত না । মানুষটা আমিই । আমার গায়ের ছাইরঙা চাদর গায়ে । গতরাতে যে বইটা পড়ছিলাম সেই বইটাই সাথে । আমার কি চিৎকার দিয়ে ওঠা উচিত কিনা বুঝতে পারছি না । নাকি আমি স্বপ্ন দেখছি? স্বপ্ন এমন বাস্তবের মত হয়? আমার এখন যে অনুভূতি হচ্ছে সেটাকে সম্ভবত তবদা খেয়ে যাওয়া বলে । আমি তবদা খাওয়া অবস্থায় রান্নাঘরে এসে কফি বসালাম । তারপর আবার ড্রয়িং রুমে এসে দেখি কেউ ঘুমুচ্ছে না আর কাউচে । শুধু বইটা পড়ে আছে । আমি অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম । বোধহয় চোখে ভুলভাল দেখছিলাম । রাতে কোনসময় হয়তো বইটা স্টাডিতে রাখতে গিয়ে এখানে ফেলে গিয়েছিলাম, সেটাই পরে ঘুমন্ত আমি হয়ে আমার চোখে ধরা দিল । তাও মনের খচখচানিটা গেল না ।

রাস্তায় জ্যাম ঠেলে অফিসে যেতে আজ একটু দেরী হয়ে গেল । আমি মোটামুটি মানের একজন আর্কিটেক্ট । একটা বড়সড় ফার্মে গড়পড়তার একটা টিম নিয়ে আমার কাজ । টিমের বাকি লোকজন আমাকে সম্ভবত পছন্দ করে না । আমি অবশ্য একটু বেশী সময় অফিসে থাকি, ওদেরও একটু বেশী সময় বসিয়ে রাখি । মাঝেমধ্যে বকাঝকা করি । আসলে এসব ইচ্ছে করেই করা । একটু দূরত্ব থাকা ভাল । আমি অন্তর্মুখী মানুষ । বেশী মানুষের কথাবার্তা আমার শুনতে ভাল লাগে না । আমি নিয়ম মেনে কাজ করি, কারও সাথে কোন ঝামেলায় নেই । আজও অফিসে পৌছে সরাসরি নিজের রুমে চলে আসি, রুমে ঢুকতে গিয়ে আবার হোঁচট খাই, ঝাপসা কাঁচের ভেতর দিয়ে মনে হচ্ছে আমার চেয়ারে কেউ বসে আছে । দোটানা নিয়ে ঢুকে দেখলাম না, কেউ নেই । মাথাটা কাজ করছে না বোধহয় । একটু পর সাব্বির এসে হাজির । ছেলেটা টিমে নতুন, চটপটে, কাজ বোঝে ।

— বস আজকে যে ডিজাইনটা দিতে বলেছিলেন সেটা আপনাকে মেইল করে দিয়েছি

— মেইল করার কথা তো পরে, আগে হার্ডকপি দেখাতে বলেছি না সবসময়?

— সরি বস, এমএজ গ্রুপের হেড অফিসের প্রজেক্ট নিয়ে ক্লায়েন্টকে কখন সময় দিব?

— আজকে তো বসার কথা, এক কাজ করুন বেলা বারোটার দিকে বলেন । ২ টার মধ্যে তাহলে শেষ হয়ে যাবে

— বস, একটায় তো লাঞ্চ

— মানে? মিটিং শেষে লাঞ্চ করলে কী সমস্যা?

— বস, আপনি তো একটার টাইম ফিক্স করে মেইল দিলেন ।

চমকে উঠলাম । আমি টিম মেম্বার সহ লাঞ্চ, আউটিং এসবে নেই । কখনও আগ্রহ পাই নি । তাই এদের নিয়ে লাঞ্চে যাওয়ার প্রশ্ন আসে না । তাও মেইলে চোখ বুলাই । আসলেই সকালে আমি সবাইকে নিয়ে দুপুর ১টায় খাওয়ার শিডিউল দিয়েছি । এমনটা হওয়ার কথা না, এই মেইল আমি দেই নি । কেউ রুমে এসে আমার কম্পিউটারে বসে এ কাজ করবে তাও না । পাসওয়ার্ড জানে না কেউ । তাও মেইল চলে গিয়েছে । সকালে না, তবদা খেয়ে গেছি মনে হচ্ছে এখন ।

— ও হ্যাঁ । আচ্ছা ওদের ৩টায় টাইম দিন । আর দেখেন অফিসে কাছে ভাল রেস্টুরেন্ট কোনটা আছে

— জ্বী বস

মাথা চক্কর দিচ্ছে । হচ্ছেটা কী । আমি লজিক্যাল মানুষ বলে নিজেকে মনে করি । কিন্তু মাথায় কোন লজিক আসছে না । আরেকটা আমি কোথেকে আসলো? কেন আসলো? নাকি আমার কোন মানসিক সমস্যা হয়েছে? এটাই কি লজিক? যাই হোক, পরে চিন্তা করব ভেবে কাজে মন লাগাই ।

সাড়ে এগারটার দিকে অফিসের নিচের টং এ চলে এলাম । এক কাপ চায়ের সাথে সিগারেট ধরাই । স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে আছে মনে হচ্ছে । চায়ে চুমুক দিতে দিতে আবার বিষম খেয়ে গেলাম । টং এ সেই আমি বসে আছি । একই নেভী ব্লু শার্ট গায়ে । হাতে সিগারেট আর চা । পাশে বসা আরেকজনের সাথে গল্প করছি । এক আমি দাঁড়িয়ে আরেক আমি বসে গল্প করছি এ কীভাবে সম্ভব?

অফিস রুমে এসে মাথা গরম করে বসে আছি তো আছি । একসময় সাব্বির এসে বলল যে লাঞ্চের টাইম হয়ে গেছে । অফিসের কাছেই অলিভ গার্ডেন নামে এক রেস্টুরেন্টে এসেছি পুরো টিম নিয়ে । প্রথম প্রথম সবাই একটু জড়তা নিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করছিল, সম্ভবত গম্ভীর বসের সাথে ওরা ঠিক জুত পাচ্ছে না । ভাবলাম একটু কথাবার্তা না বললে এরা সহজ হবে না । দু’এক কথা বলার পর দেখলাম সবাই খুব বন্ধুসুলভ হয়ে উঠল । আমিও নিজের এই টিমের সম্পর্কে জানলাম নানা কথা । প্রায় ২ বছরের বেশী সময় ধরে এই টিম নিয়ে কাজ আমার, অথচ আমি জানতামই না স‌োহেল একটা ব্যান্ডে গিটার বাজায় অবসরে । নিতু মেয়েটা নাকি চমৎকার আবৃত্তি করে । জব্বার সাহেবের মেয়ে এবার এসএসসি দেবে । ইশরাতের বাসা আমার বাসার কাছেই । নিজের কাছেই লজ্জিত হয়ে গেছি । এতদিন ধরে এই লোকগুলো আমার কথায় কাজ করেছে, পরিবারকে সময় না দিয়ে অফিসে বসে ছিল অথচ আমার সাথে ওদের ছুটি কিংবা জরুরী কাজে একটু আগে বের হওয়া ছাড়া তেমন কোন কথা হয় নি । নিজের মনেই ঠিক করি, না এখন থেকে মাঝে মাঝে এদের সাথে আরও গল্পটল্প করতে হবে । শুধু ধমক-ধামকে কাজ হয় না । বরং একটু সিমপ্যাথি, বন্ধুত্ব এদের মধ্যে থেকে সেরাটা নিয়ে আসবে । এমনকি ভাবলাম ম্যানেজম্যান্টকে বলে এদের জন্য ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখব ।

ভাল একটা লাঞ্চের কারণেই কিনা সবাই আজকে খুব ভালমত কাজ করে গেল । সাড়ে পাঁচটায় ভাবলাম আজ আর নয় । সবাইকে বাসায় চলে যেতে বলে নিজেও বের হয়ে গেলাম । গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে শহরের ব্যস্ত বিকেল দেখছি । আহ, কতদিন পর যেন মানুষের ব্যস্ততা দেখলাম । সবার চোখেমুখে বাড়ি ফেরার তাড়া, নিজের প্রিয়মুখ দেখার আকুতি । আমারও কি এমন তাড়া আসে বাসায় ফেরার? আজকে আগে আগে ফিরলে কি মাইশা অবাক হবে? ওকে আরও অবাক করে দেয়া যায় না ? কে জানে, সে নিজেই হয়তো আজ দেরী করে ফিরবে । গাড়ির প্লেয়ারে গান বাজছে

♪ ♪ ♪

গানটা ভাল লাগছে শুনতে । একসময় বাসার গেট দেখা গেল, শেষ বিকেলের হেলে পড়া সূর্যের আলো এসে পড়েছে গেটের বাগানবিলাসের ওপর । ভাল লাগছে দেখতে, সকাল থেকে নানা উদ্ভট কান্ডের পর দিনটা হয়তো ভালমতই শেষ হল ।

মাইশা খানিকটা অবাকই হয়ে গেল আমাকে এত আগে ফিরতে দেখে । সাধারণত আমি ফিরতে ফিরতে ওর রান্নাবাটি শেষ হয়ে যায় । আজ দেখলাম বেচারী বেশ কষ্টই করে রান্না নিয়ে । টিভিতে খবর দেখতে বসি, ও এক কাপ কফি দিয়ে যায় । হঠাৎ মাইশার গলা শুনি, “এই, পেঁয়াজ কাটলে যে কই রাখলা?” আবার ভ্রু কুচকে ফেলি । আমি পেঁয়াজ কাটলাম কখন? ডাইনিং টেবিলে দেখি আসলেই কতগুলো পেঁয়াজ কুচি । ভাঙ্গা গলায় বললাম “ডাইনিং টেবিলে” । আর তেমন একটা কথা বলা হয় না । রাতে খেতে বসে বসে মাইশা দেখি অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে

— কী হয়েছে?

— তুমি আম্মাকে কী বলছ? আম্মা আমাকে ফোন দিয়ে বকা দিচ্ছে

— আমি কী বললাম আবার?

— তুমি নাকি আম্মাকে জিজ্ঞেস করছ যে তোমার কোন জমজ ভাই ছোটবেলায় মেলায় হারিয়ে গেছে কিনা

— ও, সেটা

— ও মানে? এটা কেমন কথা? আম্মা আমাকে বলে যে আমি তোমার খেয়াল রাখতেছি না দেখে তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছ

— আরে, আম্মুর এত কথা ধরিও না তো । আমি একটা ফান করেছিলাম আর আম্মু সেটা সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলেছে

— তারপরও, তুমি এসব আবোলতাবোল কথা বললে তো উনি টেনশন করবেই

— আচ্ছা বাবা, আমি আম্মুকে পরে বুঝিয়ে বলব । এখন গরুর মাংসটা আরেকটু দাও, মজা হইছে।

— ও বাবা, তুমি দেখি আমার রান্নার প্রশংসাও করতে পারো।

— সব ভাল কাজেরই আমি প্রশংসা করি । এত অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এমন হালকা কথা বার্তায় খাওয়া শেষ করে উঠলাম । কাল বোধহয় বইটই পড়তে গিয়ে মাথা আউট হয়ে গিয়েছিল । আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি । ঘুম ঠিকমত আসতে চায় না , এপাশ ওপাশ করতে করতে উঠে গেলাম তিনটার দিকে । বেশ শীত পড়ছে । চাদরটা গায়ে দিয়ে ডাইনিং এর দিকে আসি । মনেমনে ভয় পাচ্ছিলাম আবার না জানি কী চোখে পড়ে । দেখলাম না, ডাইনিং এ কেউ নেই । তবে স্টাডির দরজা খোলা, হালকা আলো আসছে ও রুম থেকে । স্টাডিটা আমার পছন্দের জায়গা, ওটা সাধারণত তালাই দেয়া থাকে । নানারকম বই আছে, কেউ বই নিয়ে যাবে বা পড়তে গিয়ে এলোমেলো করবে এসব আমার ভাল লাগে না । তাই মাইশাই তালা লাগিয়ে রাখার প্ল্যান করেছিল । এখন দেখা যাচ্ছে তালা খুলে কেউ ভিতরে বসে আছে । আমি বুঝতে পারছি কে বসে আছে । ঠিক করি, এখন একটা হেস্ত নেস্ত করতে হবে । স্টাডিতে একটা তোশক পাতা মেঝেতে, একটা টেবিল আর চেয়ার । বইয়ের শেলফের বাইরে আর একটা রকিং চেয়ার । চেয়ারটা দুলছে, পা মুড়ে বসে আছি আমি । হাতে খোলা বই, চোখে আমার চশমা । লুকানো স্পীকার থেকে পিয়ানো বাজছে, ক্যানন । আমি দেখি বেশ আয়েশ করেই বই নিয়ে বসেছি । ধীর পায়ে তোশকের উপর বসি, টেবিল থেকে অ্যশট্রে নামিয়ে সিগারেট ধরাই । স্টাডিতে সিগারেট খাওয়ার নিয়ম নেই, বারান্দা ছাড়া আর কোথাও সিগারেট খেতে গেলেই মাইশা রাগারাগি করে ।স্টাডিতে আবার আমিই সিগারেট খাইনা । তবুও সিগারেট নিয়ে গলা খাঁকরি দিয়ে উঠি । জিজ্ঞেস করি

— কে তুমি?

জবাব আসে না, খালি রকিং চেয়ারের দুলুনি বন্ধ হয়ে যায় । আবারও প্রশ্ন করি তুমি কিভাবে এখানে বসে আছো আমি সেজে? রকিং চেয়ার আবার দুলতে থাকে । সে কি আমাকে দেখতে পাচ্ছে না? নাকি অগ্রাহ্য করে যাচ্ছে? আবার কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাব তখনই দরজায় মাইশা চলে আসে ।

— ঘুম আসছিলো না? তুমি তো স্টাডিতে সিগারেট খাও না । আজ ধরালে যে?

স্বাভাবিক প্রশ্ন, সমস্যাটা হলো সে প্রশ্ন করেছে রকিং চেয়ারের দিকে তাকিয়ে । তার মানে কী মাইশার কাছে আমার অস্তিস্ব ওই রকিং চেয়ারে? আমি জবাব দেই

— আজ নিয়ম ভাঙ্গার দিন

— আচ্ছা, শীত করছে । দেখি আমি একটু তোমার চাদরের ভিতরে আসি

মাইশা হেটে তোশকে এসে আমার পাশে বসে, চাদরটা মেলে দেই। গুটিসুটি মেরে মাইশা আমার হাতের ওপর আধশোয়া হয়ে থাকে । চোখ বন্ধ করে যেন একটা বেড়াল শুয়ে আছে । আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি । আগে কখনও স্ত্রীর ঘুমন্ত মুখ আমার দেখা হয় নি । হাত দিয়ে কপালের ওপর চলে আসা চুল সরিয়ে দেই, মাইশাকে আজ যতটা সুন্দর লাগছে গত দু’বছরে এমনটা লাগে নি কেন? নাকি আমিই খেয়াল করি নি? ওর কপালে চুমু খাই, ও নড়ে ওঠে, নিঃশ্বাস ভারী হয় । স্টাডি রুমে নিঃশ্বাস ভারী হওয়ার নিয়ম নেই । তবে আজ নিয়ম ভাঙ্গার দিন । শীতের রাতেও ঘেমে উঠি । মাইশা আমায় প্রবল আবেগে জড়িয়ে রাখে । রাতের শেষ শিশিরবিন্দু জমা পড়ে জানালায়, অনেকদিন পর বোধহয় আমার খুব ভাল ঘুম হয় । পড়াশোনা শেষ করার পর প্রথমবারের মত সকালের অ্যালার্মে আমার ঘুম ভাঙ্গে না ।

পরের ক’টা দিন আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ি । অফিসে নতুন নতুন কাজের চাপ, মাথায় নতুন নতুন আমি এর চাপ । এ ক’দিনে বেশ কয়েকবার নিজের মুখোমুখি হয়েছি, কখনও নিজেকে আবিষ্কার করেছি চায়ের দোকানে, কখনো লিফটের লাইনে, কখনো বাসার ব্যালকনিতে নিজের ছায়াকে দেখেছি গুনগুনিয়ে গান গাইতে । এ ক’দিনে নিজের মধ্যে নানা পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি । আমি যেন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছি । নিজেকে মনে হচ্ছে বাগানের পাতার নিচে জন্মে থাকা শুঁয়োপোকা, যে কিনা ব্যস্ত থাকতো খাওয়া আর ঘুম নিয়ে । এখন যেন নিজের চারিদিকে তৈরী হচ্ছে নতুন এক জগত, যে জগতে আমি প্রজাপতি হয়ে উঠছি ধীরে ধীরে । এখন অপেক্ষা কেবলই ডানা মেলার ।

তারপরও সমস্যাটা রয়েই গেছে । আজ ইশরাত এসে বলল যে ও একটু আগে বের হতে চায়, নিজের হাতেও তেমন কাজ না থাকায় ওকে বললাম চলুন আপনাকে নামিয়ে দেই । সে একটু দোটানায় পড়লেও রাজি হয়ে গেল । গাড়িতে তেমন কথা হয়নি, সে নিজেই এটাসেটা জিজ্ঞেস করলো । যখন ২৭ নাম্বারে তাকিয়ে নামিয়ে দিলাম তখন দেখলাম সে হাত নেড়ে আমাকে বিদায় জানাচ্ছে, শুধু তাকিয়ে আছে আমার গাড়ির চেয়ে আরও কয়েক ফুট সামনে, যেন আমি ওখানেই আছি । বুঝতে পারছিলাম যে নতুন আমিকে আগে খালি আমি দেখতে পেলেও এখন আমার আশেপাশের মানুষরাও কখনও কখনও ক্ষনিকের জন্য দেখতে পায় । বাসায় আর গেলাম না, ডাক্তার বন্ধু রিফাতের চেম্বারে চলে গেলাম । বন্ধুদের আড্ডায় আমার যাওয়া হয় খুব কম । আজ হঠাৎ আমাকে দেখে রিফাত বেশ খুশিই বলে মনে হলো ।

— তুই হঠাৎ কী মনে করে? শরীর ভাল তো?

— শরীর খারাপ ছাড়া তোর চেম্বারে আসা যাবে না?

— আরে যাবে না কেন, তুইই তো আসিস না

— এই যে, আজকে এলাম । চল চা খাওয়াবি

— রোগী দেখা শেষ করে নেই । ভাবীকে বলে দে আজ বাইরে থেকে খেয়ে আসবি

— না রে, বেচারী না খেয়ে থাকবে

বলেই মনে হলো, আমি তো এমন কথা বলি না । বরং প্রায়ই বাইরে থেকে খেয়ে গেলেও মাইশাকে জানাতে মনে থাকে না । সে না খেয়ে বসে থাকে, পরে একা একা খায় । খাওয়ার সময় তার পাশে বসাও হয় না ।

— আরে, বিয়ের দু’বছর পরও দেখি প্রেম কমে নি

— বাজে কথা বলিস না, চল

রিফাতকে নিয়ে চায়ের দোকানে চলে আসি । এ কথা সে কথা বলার পর আবিষ্কার করি বন্ধুদের মাঝে অনেক নতুন নতুন খবর আছে । আমিই কিছু জানতাম না । রিফাত আমাকে বন্ধুদের গ্রুপে এড করে দেয় । তাতে নাকি সব ব্যাপারে আপ টু ডেট থাকা যাবে । ইচ্ছে না থাকার পরও আপত্তি করি না । আরও কিছুক্ষণ পর আসল কথা তুলি

— আচ্ছা, রিফাত তোকে প্রশ্ন করি একটা? কারও সাথে শেয়ার করিস না

— আমি তো মেডিসিনের ডাক্তার, আমাকে এসব প্রশ্ন করে লাভ কী? নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি ডঃ নকীবের কাছে চলে যা

— আরে শালা, তোর কোন বদল নাই? এসব কী কথা

— তুই তো বললি গোপন প্রশ্ন

— শোন তো আগে, তুই কি ওই বেঞ্চিতে আমাকে বসে থাকতে দেখছিস?

— কী বলিস এগুলো? তুই আমার সামনে দাড়ানো । ওখানে বসে থাকবি কী করে?

— সেটাই তো প্রশ্ন । আমার তো ওখানে বসে থাকার কথা না । তাও আমি বসে আছি

— মানে কী? বুঝিয়ে বল সব

— ক’দিন ধরে আসলে হঠাৎ হঠাৎ আমি আমাকে দেখি । আমার সামনে । সে আমার মতই আমার নিত্যদিনের কাজ গুলো করে । অফিসে যায়, বই পড়ে, চা খায় ।

— তোর কি ঘুমের সমস্যা হচ্ছে?

— আমার তো ঘুমের সমস্যা অত ছিল না । তবে আমাকে প্রথম দেখার পর থেকে মাঝে মাঝে ঘুমুতে পারছি না

— আমার মনে হয় তুই অতিরিক্ত প্রেশারে আছিস । একটু রেস্ট নে

— না প্রেশার না, প্রেশার নিয়ে আমি গত ৬ বছর ধরে কাজ করছি । এটা প্রেশারের ইস্যু না

— হতে পারে । তাও ৬ বছরে তোর বয়স বেড়েছে । কমে তো নি

— সেটা ঠিক । তবে আমাকে খালি আমি না অন্যরাও দেখে

— অন্য কারা?

— অফিসের কলিগ, মাইশা

— ওরা বলেছে তোকে যে ওরা দু’টো রাহাতকে দেখেছে?

— না, কারণ ওরা যখন তাকে দেখে তখন আমাকে দেখে না ।

— এটা তুই কিভাবে জানিস?

— তা জানি না । কিন্তু জানি ।

— আচ্ছা, মানলাম তোর কথা । তাও তুই আমার কথা শোন । ক’দিন ছুটি নে । ভাবীকে নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আয় । কাজ টাজ বাদ দে । জীবনে কাজই সব না । কাজের জন্য জীবন না, জীবনের জন্য কাজ ।

— তারপর?

— এরপরও যদি তোর সমস্যা না যায় তো আমরা আবার কথা বলবো এটা নিয়ে

রিফাতের সাথে কথা বলে খুব একটা লাভ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না । সে আমাকে ভাবছে আমি ক্লান্ত দেখে চোখে ধান্দা দেখছি । কিন্তু আমি জানি আমি কী দেখি । তাও মনে হলো রিফাতের কথা শুনে দেখব । কাজকর্মগুলো একটু গুছিয়ে নেই । তারপর রেস্টে থাকবো ক’দিন । ভাবতে ভাবতে গাড়ি সিগন্যালে আটকায়, কোথা থেকে ছোট্ট একটা মেয়ে বেলীফুলের মালা নিয়ে আসে । একটা মালা ১০ টাকা । ১০ টাকায় এক মুঠো সাদা সুখ । আচ্ছা, মাইশা কি বেলীফুল পছন্দ করে? ওর জন্য নিয়ে গেলে কেমন হয়? ওকে কখনও ফুলটুল কিনে দেয়া হয়নি । ও কি খুব অবাক হবে? সামনের গাড়ি চলতে শুরু করেছে । দ্রুত একটা মালা নিয়ে নেই । ছোট্ট মেয়েটা হাসিমুখে চলে যায় আরেক গাড়ির দিকে । এই হাসির দাম মাত্র ১০ টাকা? জীবনে সম্ভবত এর চেয়ে ভাল কাজে আর কখনও খরচ করা হয় নি ।

দরজা খুলতেই মাইশার চিন্তিত মুখ দেখি । ডাইনিং খাবার ঢাকনা দিয়ে রাখা ।

— কী হয়েছে? টেবিলে খাবার লাগাও । অনেক খিদে পেয়েছে

— তুমি খেয়ে আসো নি?

— না, খাওয়ার কিছু নাই বাসায়?

— আরে, খাবার থাকবে না কেন? তুমি তো দেরী করলে ফিরলে খেয়ে আসো তাই জিজ্ঞেস করলাম ।

— আজ খেয়ে আসি নি ।

— আচ্ছা, ফ্রেশ হয়ে নাও

ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি ও খুটখাট করে এটা সেটা বাড়ছে, লাল-কালো শাড়িতে ওকে স্নিগ্ধ লাগছে বেশ। পা টিপে টিপে ওর পেছনে এসে ওকে জড়িয়ে ধরি । মাথায় ফুলের মালাটা বসিয়ে দেই । মাইশা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে । ওর চোখগুলোতো অনেক মায়াকাড়া, চোখের কোনটা ভিজে উঠছে ওর । একে সম্ভবত আনন্দ অশ্রু বলে । শীতের হিমেল হাওয়া বারান্দা দিয়ে বয়ে যায় । উষ্ণতার খোঁজে মাইশার ঠোঁটে ডুবে যাই আমি ।

এর পরের ক’টা দিন আরও ব্যস্ত হয়ে যাই । হাতের কাছের কাজগুলো সব গুছিয়ে নেই । টিমের লোকজন এখন অনেক স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কাজ করছে । কাজও আগাচ্ছে ভাল । বসকে বলি যে আমার ১ মাসের ছুটি লাগবে । ওনারা একটু অবাক হলেও মানা করেন নি । আমার অনেক ছুটি পাওনা আছে । সব ঝামেলা মিটিয়ে বের হই অফিস থেকে । আজ থেকে ছুটি ক’দিনের, ডানা মেলার সময় এসেছে । এসবের মাঝেও আমাকে দেখেছি, তবে গা করিনি । রিফাত তো বললই যে আমি আসলে ক্লান্ত । আসলেই আমি ক্লান্ত, আমার এখন বনলতা সেনের কাছে ছুটে যেতে হবে । এই উইকএন্ডে দু’জনের জন্য কক্সবাজারের সব প্ল্যান করা শেষ । মাইশাকে বলিনি, সারপ্রাইজ দেব । বিয়ের পর ওকে নিয়ে আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধবের বাসায় ছাড়া কোথাও নিয়ে যাওয়া হয় নি । ও নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে । গাড়ির প্লেয়ারে বাজতে থাকে

♪ ♪ ♪

আসলেই আমার এই ছুটি আরও আগেই নেয়া উচিত ছিল । কাজের জন্য জীবন না, জীবনের জন্য কাজ ।

মাইশার জন্য একগুচ্ছ গোলাপ কিনে ফেলি । ও তো মনে হয় তবদা খেয়ে যাবে, ভাবতে ভাবতেই কলিং বেল বাজাই । দরজা খুলে দিয়েই মাইশা ভেতরে চলে যায় । পরক্ষনেই আবার দরজার কাছে এসে বলে

— কেউ তো নেই

আমি সামনে তাকিয়ে রই, সামনের সে বলতে থাকে কেউ হয়তো ভুলে বেল দিয়েছিল, পরে বুঝে চলে গিয়েছে । সামনে দিয়েই মাইশা দরজা লাগিয়ে চলে যায় । মানিব্যাগ দেখি, প্লেনের টিকেট গুলো নেই । ওই তো, ওগুলো ডাইনিং টেবিলে রাখা হাতের গোলাপগুচ্ছের পাশে । মাইশার উচ্ছ্বাস দেখি আমি, আমার প্রতিবিম্ব আমার দিকে তাকিয়ে থাকে । তার ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা, আমি বুঝতে পারি শুয়োঁপোকার ডানা মেলার সময় হয়েছে । আমার অস্তিত্ব আজ এখানেই শেষ, প্রতিবিম্ব দাঁড়িয়ে থাকে । শেষ বিকেলের আলো মেঝেতে ছড়িয়ে থাকে । সেই আলোয় আমার ছায়াটা দেখতে প্রজাপতির মত মনে হয়